এখনো শীর্ষে হুমায়ূন আহমেদ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

২০১২ সালে প্রয়াত হওয়ার পরও অমর একুশে বইমেলায় পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন লেখক, নতুন বই যুক্ত হলেও পাঠকের ভালোবাসায় একটুও ভাটা পড়েনি তার প্রতি। বরং নতুন-পুরনো পাঠক, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তার উপন্যাস ও গল্পের চাহিদা এখনো সমান তালে বিদ্যমান। সহজ ভাষা, জীবনের সাধারণ ঘটনা আর অনন্য চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি যে পাঠকপ্রিয়তা তৈরি করেছিলেন, মৃত্যুর এক দশকের বেশি সময় পরও সেই জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। তার সৃষ্ট হিমু, মিসির আলী কিংবা নীলুদের মতো চরিত্রগুলো যেন পাঠকের জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে বইমেলায় তার বইয়ের স্টলগুলোয় এখনো ভিড় জমে পাঠকদের। অনেকে নতুন বইয়ের পাশাপাশি সংগ্রহ করছেন তার পুরনো বইও। বিশেষ করে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে তার বইয়ের প্রতি আলাদা আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

সরেজমিনে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশ ঘুরে দেখা যায়, ১৪তম দিনে হুমায়ূন আহমেদের বই পাওয়া যাচ্ছে এমন প্যাভিলিয়নগুলোর সামনে পাঠকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ বই উল্টেপাল্টে দেখছেন, কেউ আবার দীর্ঘদিনের পছন্দের বই খুঁজে নিচ্ছেন। সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, যেন হুমায়ূন আহমেদ নিজেই স্টলে দাঁড়িয়ে তার ভক্তদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন আর পাঠকরাও আনন্দের সঙ্গে তা সংগ্রহ করছেন।

এবারের বইমেলায় ‘অন্যপ্রকাশ’, ‘অনুপম’, ‘অনন্যা’, ‘অন্বেষা’ ও ‘কাকলী’ এই পাঁচটি প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের বই। প্রতিটি প্যাভিলিয়নেই বিভিন্ন বয়সী পাঠকদের আনাগোনা লক্ষ করা যায়। তবে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি। তারা বই দেখছেন, গল্প করছেন এবং পছন্দের বই সংগ্রহ করছেন। স্টলকর্মীরাও জানান, অন্য অনেক লেখকের তুলনায় হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের বিক্রি এখনো বেশি।

বইমেলা ঘুরতে গিয়ে অনন্যা প্রকাশনীর সামনে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর ছোট একটি জটলা দেখা যায়। কথা বলে জানা যায়, তারা রাজধানীর মুগদা থেকে বইমেলা দেখতে এসেছেন। কী বই কিনবেন জানতে চাইলে তারা জানান, তারা সবাই হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত। হুমায়ূন আহমেদের বই কেনার পরে অন্যদের বই কিনবেন।

এই দলের একজন পাঠিকা সুমাইয়া রহমান বলেন, ‘স্কুলে পড়ার সময় থেকেই হুমায়ূন আহমেদের বই পড়া শুরু করি। প্রথমে “হিমু” সিরিজ পড়ে তার লেখার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়। পরে ‘মিসির আলী’ সিরিজ, ‘অপেক্ষা’, ‘মানুষ’, ‘কে কথা কয়’সহ অনেক বই পড়েছি। তার লেখার মধ্যে এমন একটা সহজতা আছে, যা পড়তে পড়তে মনে হয় যেন নিজের জীবনের গল্পই পড়ছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসান তারিক বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা কঠিন। অনেক সময় রাত জেগেও তার বই পড়েছি। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার বইগুলোই তাকে পাঠকদের মনে জীবন্ত করে রেখেছে। নতুন অনেক লেখক আসবেন, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের জায়গাটা আলাদা।’

বইমেলার বিভিন্ন প্যাভিলিয়নে দায়িত্বে থাকা বিক্রয়কর্মীরা জানান, প্রতিবছর হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের চাহিদা সবসময়ই থাকে। ছুটির দিনে সেই চাহিদা আরও বাড়ে। বিশেষ করে ‘হিমুসমগ্র’, ‘মিসির আলী সমগ্র’ এবং ‘গল্পসমগ্র’ বইগুলো বেশি বিক্রি হয়। তরুণ-তরুণীরাই এসব বই বেশি কিনছেন।

কাকলী প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে দায়িত্বে থাকা একজন বিক্রয়কর্মী জানান, গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি কিছুটা কম। হুমায়ূন আহমেদের বইগুলোর চাহিদা বরাবরই থাকে। বিশেষ করে, তরুণ পাঠকরাই এসব বই বেশি খুঁজছেন।

অন্যপ্রকাশ প্যাভিলিয়নের একজন বিক্রয়কর্মী বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরেই পাঠকপ্রিয় লেখক। আমাদের প্রকাশনী থেকেও তার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। বইমেলা এলেই পাঠকরা তার বই খুঁজে নেন। এবারও তার বইগুলোর বিক্রি বেশ ভালো।’

সব মিলিয়ে অমর একুশে বইমেলার ভিড়ের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি বিষয় সময়ের স্রোত বদলালেও পাঠকের হৃদয়ে হুমায়ূন আহমেদের স্থান আজও অটুট। নতুন প্রজন্মের পাঠকরাও তার বই পড়ে মুগ্ধ হচ্ছেন আর পুরনো পাঠকরা ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতিময় সেই গল্পগুলোর কাছে। তাই বলা যায়, মৃত্যুর পরও তার সৃষ্টি ও চরিত্রগুলোই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পাঠকের ভালোবাসায়।

গতকাল বুধবার অমর একুশে বইমেলার ১৪তম দিনে মেলা ২টায় শুরু হয়ে ৯টায় শেষ হয়। এদিন তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১১৩টি। এ নিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২৫৫টি। মেলায় এসেছে প্রথমা থেকে মতিউর রহমানের ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী’, সময় থেকে আশরাফ কায়সারের ‘ঢাকার আড্ডা ও অন্যান্য’, বেঙ্গলবুকস থেকে তপন বাগচীর ‘কেবল চেয়েছি পেতে পাতার মহিমা’সহ বেশকিছু নতুন বই।

বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : এম শমসের আলী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। সভাপতিত্ব করেন আরশাদ মোমেন।

বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ড. শমশের আলী গবেষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন তার গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তির মাধ্যমে। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে, বিশেষত পারমাণবিক ভৌতবিজ্ঞানে তার মৌলিক গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও সমাদৃত হয়েছিল। বিশ্বের স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলোয় তার অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে এশিয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন বিজ্ঞান একাডেমি ও সংস্থার সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বিনিময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি হাসান হাফিজ, কবি শাহীন রেজা এবং কবি মাসুদুল হক।

বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন কামাল মিনা, এ বি এম সোহেল রশিদ ও শায়লা আহমেদ। সংগীত পরিবেশন করেন সাইদুর রহমান বয়াতি, অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, জি এম জাকির হোসেন, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. শাহীনুর ইসলাম, বাউল সুভাষ বিশ্বাস, মিন্টু বাউল, নিশাত আনজুম সাকি এবং এস এম শামীম আক্তার।

আজকের সময়সূচি

আজ ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : মুস্তাফা জামান আব্বাসী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন শারমিনী আব্বাসী। আলোচনায় অংশ নেবেন আশরাফুজ্জামান বাবু। সভাপতিত্ব করবেন ওয়াকিল আহমদ। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত