ষাটের দশকে যেমন ছিল সৌদির রমজান

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৭ এএম

কখনো ভেবেছেন, আমাদের বাবা-মা ও দাদা-দাদিরা রমজান কীভাবে কাটাতেন? আধুনিক প্রযুক্তির আগমনের আগে পবিত্র মাসটি কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে পরিবর্তিত করত? সেই সময়গুলো ছিল উৎসবের চেয়েও বেশি কিছু, ছিল আধ্যাত্মিকতা ও অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আরব নিউজ সৌদি আরবের কাতিফ শহরের সমাজসেবী সাবাহ আল-ফখরের মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের রমজানের গল্প শোনার জন্য। প্রায় ৮০ বছর বয়সী আল-ফখর তখন ১২ বছর বয়সী কিশোরী ছিলেন।

তিনি বলেন, রমজানের আবহ বইতে শুরু করত কয়েক সপ্তাহ আগেই। তখন পরিবারগুলো নিজেদের মানসিক, আর্থিক ও ধর্মীয়ভাবে প্রস্তুত করা শুরু করত। শাবান মাসের শেষ দিনটিকে বলা হতো ‘এওমুল দারশ’, এর অর্থ হলো চিবিয়ে বা গুঁড়ো করে খাওয়ার দিন। পরদিন রোজা শুরু হওয়ার আগে এদিন পেট ভরে খেয়ে নেওয়া হতো।

আল-ফাখর বলেন, আমরা আল্লাহর এই মাসের জন্য ১১ মাস অপেক্ষা করতাম। রমজান এলে জীবনযাত্রাই বদলে যেত এবং চারপাশ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেত। রমজানের প্রথম দিনে পুরো পাড়ার মানুষ বারাহা নামক একটি বড় খোলা জায়গায় জড়ো হতো। সেটি ছিল একাধারে বাজার ও মিলনমেলা। তখন কোনো সুপার মার্কেট ছিল না, সবকিছু আসত সরাসরি খামার থেকে। কৃষকরা তাজা শাকসবজি, ফল ও ডিম নিয়ে আসতেন। মহিলারা সেখানে ফালাফেল ও চপাতির মতো খাবার তৈরি করতেন, এমনকি কেউ কেউ বাড়িতে বানানো আইসক্রিমও বিক্রি করতে আনতেন। দুধের স্বাদও ছিল তখন একদম আলাদা। মহিলারা খামার থেকে দুধ ও লাবান নিয়ে আসতেন।

আল-ফাখর স্মৃতিচারণ করেন ফালাহাদের কথা, যারা পাম বাগানে থাকার বিনিময়ে মালিককে দুধ, ডিম ও খেজুর দিতেন। তখনকার বাড়িগুলোতে বড় বড় খোলা উঠান থাকত এবং সবাই সবাইকে চিনত। শিশুদের জন্য ছিল মজার সব খেলা, যেমন ডিম নিয়ে লড়াই, যার ডিম ভাঙত না, সে অন্যের ডিমটি জিতে নিত।

বাড়ির ভেতরে ইফতারের সব খাবার হাতে তৈরি করা হতো। আল-ফাখর বলেন, তার পরিবার রমজানের ৪০ দিন আগে চাল ভিজিয়ে রাখত এবং প্রতিদিন পানি পরিবর্তন করত। পরে সেই চাল শুকিয়ে গুঁড়ো করে মুহাল্লাবিয়া বা মাফতুতার মতো মিষ্টি বানানো হতো। বিকেলে বাড়ির সব নারীরা মিলে কেউ কাবাব তৈরি করতেন, কেউ সামবুসা ভাঁজতেন, আবার কেউ ময়দা মাখাতেন।

মাগরিবের আজানের আগে পাড়ার দৃশ্যটি ছিল দেখার মতো। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা থালায় করে ইফতার নিয়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছুটত। ইফতারের পর চলত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে যাতায়াত। আল-ফাখরের মতে, সেই মিলনমেলা ছিল অনেক বেশি আন্তরিক, যা আজকের জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার পার্টির চেয়ে আলাদা।

সাহরির সময়টা ছিল আরও চমৎকার। এখনকার মতো মানুষ রাতভর জেগে থাকত না, বরং সাহরি তৈরি করে ঘুমিয়ে পড়ত। এরপর ঢোলবাদকের ডাকে সবার ঘুম ভাঙত। ঢোলবাদকরা গলিতে গলিতে গজল গেয়ে মানুষকে সাহরির জন্য জাগিয়ে তুলতেন। প্রতিটি মহল্লায় একজন করে ঢোলবাদক থাকতেন এবং শিশুরা জানালার পাশে ভিড় করত তাকে দেখার জন্য।

ঈদ এলে মহিলারা নিজেদের কাপড় নিজেরাই সেলাই করতেন। কোনো শপিং মল বা তৈরি পোশাকের দোকান ছিল না। ঈদের আগের রাতে ঢোলবাদক আবার আসতেন চাঁদ দেখার খবর নিয়ে। তখন তাকে বকশিশ দেওয়া হতো। ঈদে দাদাবাড়িতে বাড়িতে যাওয়া এবং দুপুরের খাবারের মাধ্যমে একান্নবর্তী পরিবারের মিলনমেলা বসত।

আল-ফাখর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। রাস্তাঘাট এখন আগের চেয়ে শান্ত, মানুষের সামাজিক যোগাযোগও কমেছে। আগের সেই সাধারণ খাবারগুলো এখন অনেক বেশি জটিল ও কৃত্রিম হয়ে গেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত