মালদ্বীপে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ বাংলাদেশি নিহত

স্বজনের আহাজারি বাড়িতে বাড়িতে

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

মালদ্বীপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে পাঁচ বাংলাদেশি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশে তাদের স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গত শুক্রবার ভোরে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনার খবর দেশে পৌঁছাতেই নিহতদের বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয়েছে আহাজারি-আর্তনাদ। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

অগ্নিদুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন নূরনবী সরকার, সদর আলী, তাজ উদ্দিন, রবিন মোল্লা ও সফিকুল ইসলাম। এদের মধ্যে নূরনবী সরকারের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ময়দানহাটা ইউনিয়নের জামালপুর এলাকায়। সদর আলী হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মহব্বতখানি গ্রামের বাসিন্দা। তাজ উদ্দিনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজিপাড়ায়।

সরেজমিনে গতকাল শনিবার তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের পরিবার সদস্যদের কান্নায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। গ্রাম জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। 

পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা প্রত্যাশায় বগুড়ার নূরনবী সরকার ২০১৬ সালে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন মালদ্বীপের দিঘুড়া আইল্যান্ডে। কথা ছিল আগামী ঈদুল আজহার পর ১০ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে বাড়ি ফিরবেন। নতুন সংসার গড়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! নূরনবী তার আগেই ফিরছেন বাড়িতে। তবে, জীবিত নয়, আসবে তার মরদেহ। নূরনবী বগুড়ার শিবগঞ্জের জামালপুর এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে।

নিহত নূরনবীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে আগে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য মালদ্বীপে পাড়ি জমায় নূরনবী সরকার। প্রায় ১০ বছর পর প্রবাস জীবন শেষে আগামী কোরবানি ঈদের পর বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরার খবরে আনন্দিত পরিবারের সদস্যরা নিচ্ছিলেন নানা ধরনের প্রস্তুতি। এরই মধ্যে খবর আসে নূরনবী মারা গেছেন। হঠাৎ এমন খবরে দিশেহারা পরিবারের সদস্যরা।

নিহত নূরনবীর বাবা আব্দুস সালাম বলেন, ‘ছেলে আমার প্রবাসে গেছে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করার জন্য। পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরেছে, কিন্তু সন্তান তো ফিরছে লাশ হয়ে। মরদেহ দেশে আনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি স্থানীয় প্রশাসনের কেউই। যত দ্রুত সম্ভব আমার সন্তানের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক।’

হবিগঞ্জের সদর আলী (৪৫) প্রায় তিন বছর আগে জীবিকার তাগিদে মালদ্বীপে যান। সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। সদর আলীর সহকর্মী হাসান মোবাইল ফোনে জানান, গত শুক্রবার ভোরে মালদ্বীপের দিঘুড়া দ্বীপের একটি বাড়িতে সাহরির জন্য রান্না চলছিল। হঠাৎ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঘরের ভেতরে পাঁচজন আটকা পড়েন। ঘটনাস্থলেই সবার মৃত্যু হয়।

ছয় মাস আগে পরিবারের হাল ধরতে মালদ্বীপে পাড়ি জমান তাজ উদ্দিন। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাজিপাড়া এলাকার কাচারিবাড়ির আবুল কাশেমের ছেলে। তার স্ত্রী আনন্তি বেগম জানান, ঘটনার দুদিন আগে স্বামী তাজ উদ্দিনের সঙ্গে তার কথা হয়। এ সময় ঈদের কেনাকাটার জন্য কিছু টাকাও পাঠানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু কে জানে, এই কথাই জীবনের শেষ কথা।

ছেলে তাজ উদ্দিনের মৃত্যুর খবর শুনে তার বৃদ্ধ মা শোকে অনেকটা নির্বাক হয়ে পড়েছেন। তাজ উদ্দিনের বাবা আবুল কাশেম বলেন, ‘পরিবারের অভাব দূর করতে মালদ্বীপে গিয়েছিল আমার ছেলে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে তার মৃত্যুতে আমাদের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তার চার মাসের শিশুকন্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েছি।’ দ্রুত ছেলের লাশ দেশ ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা বেগম বলেন, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পৌঁছেনি। তবে বিষয়টির খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি মোরশেদ আলম জানান, বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। মৃত্যুর বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বগুড়া, হবিগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত