দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এ উৎসব সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও ঢাকা ছাড়ছে ঘরমুখো মানুষ। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে ঈদযাত্রায় প্রতি বছরই ভোগান্তিতে পড়েন তারা। তবে এবারের ঈদযাত্রায় গত বছরের সেই চিরচেনা ভোগান্তি কিছুটা লাঘব হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবারও সড়ক ও রেলপথে অনেকটাই স্বস্তিতে বাড়ি ফিরেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে সড়কপথের কিছু কিছু জায়গায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাছাড়া জ¦ালানি সংকট এবং দূরপাল্লার ট্রিপের কারণে রাজধানীতে গণপরিবহন সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। সিগন্যালসহ কিছু কিছু পয়েন্টে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না ঘটলেও দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের চাপে বেশ কিছুটা ভিড় দেখা গেছে।
তেল সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া : দুপুর সাড়ে ১২টা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড়ে গতকাল পদ্মা সেতুমুখী অস্থায়ী বাসস্ট্যান্ডে ব্যাগ, লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে গজগজ করছিলেন দুই তরুণ। মো. আরাফাত হোসেন নামে একজন দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি করেন। ঈদুল ফিতরের কয়েক দিনের ছুটিতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। কিন্তু জ¦ালানি তেলের সংকটের অজুহাত দেখিয়ে এ রুটের পরিবহনগুলো ২৫০-৩০০ টাকার ভাড়া এখন চাইছে ৬০০ টাকা! আরাফাত বলেন, ‘দেশটা কি মগের মুল্লুক হয়ে গেল নাকি?’ এ যাত্রীর বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া গেল পদ্মা সেতুমুখী কয়েকটি পরিবহনে। এখান থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ২০টি জেলার বাস যাতায়াত করে। ঈদের মতো উৎসবে যাত্রাবাড়ী এলাকায় যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। তবে গতকাল যাত্রীর চাপ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। অভিযোগ ছিল যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট উভয়ের। ঈদযাত্রায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার চারটি পয়েন্টে থেমে থেমে যানজট দেখা গেলেও তা তীব্র ছিল না। ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী রুটে চলাচলকারী ‘মহানগর এক্সপ্রেস’র কাউন্টারে বরিশালের ভাড়া হাঁকা হচ্ছিল ৬৫০ টাকা করে। কাউন্টারম্যান কাইয়ুম মিয়া দেশ রূপান্তরকে জানান, কয়েক দিন ধরে গাড়ি চালাতে তারা তেল পাচ্ছেন না। গাড়ির ট্রিপ কমে গেছে। পাম্পগুলোতে ১২০ লিটার তেল চাইলে দেয় ২০ লিটার। যাত্রীও কম। তাই ভাড়া একটু বেশি নিতে হচ্ছে।
‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ কাউন্টার থেকে নড়াইল যেতে ৬০০ টাকায় একটি টিকিট কিনেছেন মো. সোহাগ মিয়া। তিনি জানান, এমনিতে ৪৫০ টাকা ভাড়ায় তিনি গ্রামের বাড়িতে যান। কিন্তু ঈদের এই যাত্রায় তার কাছ থেকে ১৫০ টাকা বেশি রাখা হয়েছে। একই কাউন্টারের সামনে রাখা নড়াইলগামী বাসে ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মো. ইব্রাহিম মিয়া। ভাড়া কত টাকা লাগবে, জিজ্ঞাসা করলে কাউন্টার থেকে বলা হয় ৪০০ টাকার কমে হবে না। ইব্রাহিম বলেন, ‘সরকার তো বলেছে, ঈদের যাত্রায় তেল পেতে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু শুধু শুধু বাড়তি ভাড়া চাইছে। বাড়ি তো যেতে হবে। অন্য কোনো বাস দেখতে হবে।’
নড়াইল এক্সপ্রেস কাউন্টারম্যান সুজন মিয়া বলেন, এই পাম্প, সেই পাম্প ঘুরে ১০০ লিটার তেল মেলানো যাচ্ছে না। আর যে গাড়িগুলো যাচ্ছে, ফিরতি পথে আসছে খালি হয়ে। আমাদের তো পোষাতে হবে। ফরিদপুরগামী ‘সাদ সুপার ডিলাক্স’ পরিবহনের কাউন্টারম্যান গোবিন্দ পোদ্দার বলেন, ফরিদপুরে যেতে ৪০০ ও ঝিনাইদহে যেতে ৬৫০ টাকা ভাড়ায় টিকিট বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগ নেই। খুলনাগামী ‘রাজীব’ পরিবহনের সামনে দেখা গেল ৬০০ টাকা করে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। টিকিট বিক্রিকারী জুয়েল মিয়া বলেন, যাত্রীর চাপ কম। তেল পেতেও সমস্যা হচ্ছে। তাই ১০০ টাকা করে বেশি নিতে হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় বিআরটিসির দোতলা বাসে মাইকিং করে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। ‘গেট লক’ সার্ভিস উল্লেখ করে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা করে। পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলেন, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত তারা এ সার্ভিস অব্যাহত রাখবেন। এদিকে দুপুর দেড়টার দিকে সায়েদাবাদ গোলাপবাগ বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে যাত্রীর ভিড় বা চাপ কোনোটাই দেখা যায়নি। কিশোরগঞ্জগামী ‘অনন্যা সুপার’ পরিবহনে ৩৭০ টাকা ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করতে দেখা গেছে।
সরেজমিনে গাবতলী ও কল্যাণপুর : রাজধানীর গাবতলী ও কল্যাণপুর বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই যাত্রীরা বাড়ি যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসতে থাকেন। তবে যারা আগে টিকিট কেটে রাখেননি, শেষ মুহূর্তে টিকিট পেতে তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।
কল্যাণপুর টার্মিনালে কথা হয় শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মো. রাশেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিনের তুলনায় বাসের সংখ্যা বাড়িয়েছি। কারণ, এ সময়ে যাত্রীদের বাড়তি চাপ থাকে। ইচ্ছা ছিল আরও বেশি বাস চালাব কিন্তু এবার তেলের কারণে পারছি না। আমাদের সব টিকিট আগে থেকেই বিক্রয় হয়ে গেছে। আজ থেকে চাপ আরও বাড়বে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
গ্রামীণ ট্রাভেলসে অপেক্ষায় থাকা রাজশাহীগামী যাত্রী পলাশ ইসলাম বলেন, বছরে এ সময়টার জন্যই অপেক্ষা করি। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি বাসের টিকিট শুরুতেই কেটেছি, তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি। সবকিছু অপেক্ষা করে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারব, এটাই বড় কথা।
এদিকে, গাবতলী টার্মিনালে কিছুটা বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। আগাম টিকিট বিক্রি করায় কাউন্টারে তেমন ব্যস্ততা ছিল না। গাবতলী বাস টার্মিনালে হানিফ পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে থেকে টিকিট কাটা যাত্রীরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও যারা শেষ মুহূর্তে আসছেন, তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকে ভাবছেন আমরা টিকিট আটকে রেখেছি। কিন্তু সব টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। অনেক যাত্রী তাদের টিকিট বাতিল করছে। আমরা সেই টিকিট এখন বিক্রি করছি।
মিরপুরের বাসিন্দা রাকিব হাসান রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। আলাপকালে তিনি বলেন, আমি এক সপ্তাহ আগে টিকিট কেটেছি, তাই তেমন সমস্যা হয়নি। তবে যানজট আছে কি না, বুঝতে পারছি না। এখনো যানজটের খবর পাইনি, তাই একটু ভালো লাগছে। একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা সুমি আক্তার বলেন, ‘অনেক কষ্টে একটা টিকিট পেয়েছি, তাও বেশি দামে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করব, তাই কষ্ট করেই যেতে হচ্ছে। আমি ও আমার বোন একসঙ্গে যাচ্ছি। একসঙ্গে যাব বলেই এক দিন আগে ছুটি নিয়েছি।’
মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকেও দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ঈদযাত্রীদের নিয়ে বাস ছেড়ে গেছে। কিছু কিছু বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। মহাখালী টার্মিনালে নেত্রকোনাগামী যাত্রী আশিকুর রহমান বলেন, সব বাসেই বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে। তাদের দাবি করা ভাড়া দিতে রাজি না হলে বাসেই তুলছে না। ফারজানা ইয়াসমিন নামে অন্য যাত্রী জানান, ময়মনসিংহগামী সব বাসেই দ্বিগুণ ভাড়া হাঁকা হচ্ছে। আর গন্তব্যে যেখানেই হোক, ভাড়া দিতে হচ্ছে শেষ স্টপেজের।
ট্রেনে উপচেপড়া ভিড় : আসন্ন ঈদ কেন্দ্র করে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। গতকাল সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রীরা স্টেশনে ভিড় করছেন। সরেজমিন দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে চালু হওয়া বিশেষ ট্রেনের পাশাপাশি নিয়মিত ট্রেনগুলোতেও তীব্র যাত্রীচাপ রয়েছে। নির্ধারিত ট্রেনে উঠতে অনেক যাত্রী আগেভাগেই স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছেন। টিকিটধারীদের পাশাপাশি অনেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়েও যাত্রা করছেন।
গতকাল ভোর ৬টায় রাজশাহীগামী ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে দিনের ট্রেনযাত্রা শুরু হয়। এরপর যথাসময়ে ঢাকা ছাড়ে নীলনাগর, সুন্দরবন, এগারো সিন্দুর প্রভাতী এবং তিস্তা এক্সপ্রেসসহ অন্যান্য ট্রেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির কারণে বিনা টিকিটে কেউ প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে পারছে না। সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী আরিফ জানান, ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে আসায় তিনি খুব খুশি। ভোগান্তি ছাড়া ঈদযাত্রার ব্যবস্থা করায় রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
ঈদযাত্রায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার তিন স্তরের নিরাপত্তা ও টিকিট চেকিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বিনা টিকিটে ভ্রমণ ঠেকাতে স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সময় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।