প্রায় ৩ সপ্তাহ ধরে চলমান ইরান যুদ্ধ ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্বিমুখী সংকটের মুখে। সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন নিষিদ্ধ করায় একদিকে বিশ্ব জুড়ে তেলের বাজার টালমাটাল হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে ক্রমশ বিশ্ব জুড়ে খাদ্য সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডস কর্পসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়েছে। এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। এই ঘোষণার পর তেলের দাম একলাফে ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেল ছাড়িয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের পাশাপাশি একটি অন্য সংকটও সামনে আসছে তা হলো সারের ঘাটতি। এর কারণে বিশ্ব জুড়ে খাদ্য সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বাণিজ্যিক ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক এবং অন্য অনেক ধরনের সারই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে রপ্তানি হয়। সুতরাং এই অঞ্চলে ব্যাঘাতের ফলে বিশ্ব জুড়ে কৃষি কার্যক্রম বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাতের কারণে গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদনকারী কারখানাগুলো বন্ধ বা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত এনার্জি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি তার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থগিত করার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া কারখানাটি বন্ধ করেছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে কৃষিপ্রধান দেশগুলো। সারের ঘাটতি বিশেষ করে এশীয় এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। ভারত তার প্রয়োজনের ৪০ শতাংশ ইউরিয়া ও ফসফেট সার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। সংকটের কারণে ভারত এরই মধ্যে তাদের তিনটি ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন কমিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সয়াবিন রপ্তানিকারক ব্রাজিল তাদের প্রয়োজনীয় সারের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করে। সারের অভাবে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। শিপিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠান সিগনাল গ্রুপ জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে সারের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় উপসাগরীয় দেশগুলোতে। ইউরিয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৪৬ শতাংশ। কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানি একাই বিশ্বের ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে।
ক্রমবর্ধমান ঘাটতির কারণে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়ার রপ্তানি দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য প্রতিবেদনকারী বিশেষায়িত সংস্থা আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত এর দাম প্রতি টনে ৫০০ ডলারের কিছু কম থেকে বেড়ে ৭০০ ডলারের বেশি হয়েছে। এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। তথ্য বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্ব জুড়ে সারের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে। মর্নিংস্টারের বিশ্লেষক সেথ গোল্ডস্টাইন জানিয়েছেন, নাইট্রোজেন সারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে, আর ফসফেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলো সারের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হওয়া ইউরিয়ার ৩৫ শতাংশ, সালফারের ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ৬৪ শতাংশ পায়। ভারত, ব্রাজিল ও চীনের মতো বড় দেশগুলোর কৃষি বাজারের জন্যে মধ্যপ্রাচ্যের সার তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি এবং মূল্যের ঊর্ধ্বগতি কৃষকদের সার ব্যবহার না করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে ফসলের ফলন কমতে পারে। ফলে বিশ্ব জুড়ে চাল, গম, ভুট্টা, সয়াবিনের মতো প্রধান ফসলের সরবরাহ কমে যাবে। এতে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।
