বাহারি সেমাইয়ে ক্রেতার অপেক্ষা

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৮:১০ এএম

মেরুল বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্টের ৭ নম্বর রাস্তার মুখেই... মামা ভগিনা সুপার স্টোর। মুদি দোকানটির সামনে একটি বড় বাক্সে খানিকটা রাস্তার ওপরেই সাজানো হয়েছে নানা পদের সেমাই। নানা ব্র্যান্ডের লম্বা এবং লাচ্ছা সেমাইয়ের প্যাকেট। বিক্রির জন্য সেমাইয়ের প্রদর্শনীটা গতকাল থেকেই দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগের দুদিন মুদি দোকানে সেমাইয়ের বিক্রি সবচেয়ে বেশি জমজমাট। এ কারণে প্রস্তুতিও থাকে বেশি। দোকানগুলোর সামনেই এসব পণ্য সাজিয়ে রাখেন বিক্রেতারা, যাতে শুরুতেই ক্রেতার চোখ আটকায়।

শুধু এই বাড্ডায় নয়, ঢাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লাসহ কারওয়ান বাজারেও বিশেষভাবে সেমাই প্রদর্শন করা হয় দোকানগুলোতে। দোকানিরা কার কাছে কত পদের সেমাই পাওয়া যায় সেটাই জানান দেন প্রদর্শনীর মাধ্যমে। গ্রামের মতো করে ঢাকাতেও অনেক স্থানে রঙিন খোলা সেমাই বিক্রি করতে দেখা যায়।

দোকানিরা জানান, মানুষ জামা-জুতা কেনা শেষ করে মুদি দোকান, সুপারশপেই ফিরে আসে। কারণ শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় থাকে নানা পদের সেমাই, চিনি, সুগন্ধি চাল, কিশমিশ, গুঁড়া দুধ, এলাচ, দারুচিনি, নানা পদের বাদাম, গরম সমলা পেঁয়াজ থেকে নানা জিনিস, যা এলে ঈদের দিনের খাবারের আয়োজনকে মুখরোচক করার জন্যই ধনী-গরিব সবাই কেনেন।

সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের দ্বিতীয়তলার মামা-ভাগিনা স্টোরের বিক্রেতা শরিফুল জানান, ঈদের আগের ঠিক দুদিন মুদি দোকানগুলোতে সব কাস্টমার সেমাই চিনি সুগন্ধি চালের জন্য ভিড় করে। দুদিনেই দোকাগুলোতে বড় ধরনের ব্যবসা হয়। সেজন্য প্রস্তুতিও আগে থেকেই থাকে। আজ বিকেল বা সন্ধ্যার পর থেকেই এই বিক্রিটা শুরুর আশা করছি।

ঢাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কুলসন, প্রাণ, এসিআই, কিষোয়ান, বোম্বে সুইটস, বনফুল, ইফাদ, বিডি ফুড, ড্যান ফুড, ডেকো, পুষ্টি, ওয়েল ফুডসহ নানা ব্র্যান্ডের সেমাই বাজারে ভরা। লম্বা সেমাইগুলোর প্যাকেট মোটামুটি সব কোম্পানির প্যাকেট একই ধরনের। সেমাইয়ের চেহারা ও পণ্যের পরিমাণেও খুব বেশি পার্থক্য নেই। সেগুলো সবই বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়।

তবে কোম্পানিগুলো সব মুনশিয়ানা দেখায় লাচ্ছা সেমাই উৎপাদনে। লাচ্ছার ক্ষেত্রে দুই ধরনের প্যাকেজিং লক্ষ করা যায়। সাধারণ মানের পলি প্যাকেটে সব কোম্পানিই ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম সেমাই সরবরাহ করে। যার দামও নির্দিষ্ট, ৫০ টাকা। তবে পার্থক্য করা হয় বড় প্যাকেটে। যেগুলো প্রিমিয়াম মানে বিবেচনা করা হয়। এ ধরনের সেমাইগুলো ২৫০ গ্রাম ওজনের কোনো কোনোটা বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকায়। কারণ এই প্রিমিয়াম মানের সেমাইগুলোর প্যাকেটে নানা পদের বাদাম, কিশমিশসহ বহু বাড়তি উপাদান যুক্ত করা থাকে। এজন্য এগুলো উপস্থাপনা এবং দামেই সাধারণত কোম্পানিগুলো বিশেষ ঢং তৈরির চেষ্টা করে।

কারওয়ান বাজারের এক মুদি দোকানি শফিউর জানান, ‘রোজার ঈদের আগে যে পরিমাণ সেমাই বিক্রি হয়, সেটা বছরের আর কোনো সময়েই হয় না। যে কারণে এই ঈদের আগে কোম্পানি এবং দোকানি দুপক্ষেরই বাড়তি প্রস্তুতি থাকে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদে মিষ্টান্নের মধ্যে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার সেমাই। ধনী-গরিব সবার ঘরেই সেমাই রান্না হয়। এ কারণে দেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী সব কোম্পানিই সেমাই উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। কারণ সারা দেশে এর চাহিদা রয়েছে। তবে এখন শুধু ঈদ নয়, মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারগুলো নাস্তার পদ হিসেবে সারা বছরই সেমাই খাওয়ার তালিকায় যুক্ত করেছে।

এর ওপর ভিত্তি করেই দেশে গড়ে উঠেছে সেমাইয়ের বিশাল বাজার, যার আকার প্রায় হাজার কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন উৎপাদনসংশ্লিষ্টরা। এর দুই-তৃতীয়াংশই আবার বিক্রি হয়ে থাকে রোজার ঈদে।

একসময়ে সনাতন পদ্ধতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান সেমাই তৈরিতে করলেও এখন করপোরেট কোম্পানিগুলো এই পণ্যটির উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। হাতে বানানো লাচ্ছা ও চিকন সেমাই (বাংলা, বার্মিজ ইত্যাদি সেমাই নামে পরিচিত) ছিল ভোক্তা চাহিদার তুঙ্গে। তবে সময়ের পালাক্রমে সেমাইয়ের বাজার দখল করতে শুরু করেছে নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো। এতে পণ্যমান ও মোড়কজাতের উন্নয়নের পাশাপাশি দামেও এসেছে বেশ পরিবর্তন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে তৈরি করা লাচ্ছা সেমাই ছাড়াও মোড়কজাতকারী প্রায় ৪০টি ব্র্যান্ডের সেমাই বাজারে পাওয়া যায়।

উদ্যোক্তাদের একাংশ জানায়, দেশে বছরে সেমাইয়ের চাহিদা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টন। যার বাজারমূল্য প্রায় হাজার কোটি টাকা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত