টর্চার সেলে উপস্থিতিই কাল হলো মাসুদের

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০১:১৮ এএম

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে সব অপকর্মের মাস্টারমাইন্ড সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নির্যাতন করার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্য নেতা-ব্যবসায়ীদের নির্যাতনের সময় মাসুদ উদ্দিন টর্চার সেলে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে উপস্থিত থাকার সময় জোরে জোরে চিৎকার করে গালাগালও করতেন তিনি। ইতিমধ্যে তার কণ্ঠস্বর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এসব কারণেই তিনি ফেঁসে যাচ্ছেন। বিশেষ করে টর্চার সেলই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলো মনে করছে। 

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, থানায় দায়ের হওয়ায় মানবপাচার মামলার এজাহারে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম বাদ দেওয়ার পেছনে গত অন্তর্বর্তী সরকারের একজন বিশেষ সহকারী সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য এসেছে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডিবির হেফাজতে থাকা মাসুদ উদ্দিনকে গতকাল বৃহস্পতিবার কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ৫ দিনের রিমান্ডের ২য় দিন অতিবাহিত হয়েছে গতকাল। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সব বিষয়ই নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন তিনি।              

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থের দাপট আর পেশিশক্তির সংমিশ্রণে যারা এক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন, সময়ের আবর্তে তাদের পতন এখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়া প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। গোপন আস্তানায় পাওয়া ‘টর্চার  সেল’ বা নির্যাতন কক্ষের ভয়াবহতার তথ্য পেয়ে শিউরে উঠছেন তদন্তকারী সংস্থার কর্তারাও। কেবল এই কক্ষগুলোই নয়, মাসুদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে তার নিজের কণ্ঠস্বর। ডিজিটাল ফরেনসিক এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে  বের হয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের টর্চারের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।

নাম প্রকাশ না করে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনা কারণে ওয়ান-ইলেভেনের সময় যৌথবাহিনী গ্রেপ্তার করে। টর্চার সেলে আটকে রেখে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করা হয়। সেখানে মাসুদ উদ্দিনসহ আরও একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তারা রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে আজেবাজে প্রশ্ন করতেন। আরেকজন ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, টর্চার সেলে শারীরিকভাবে নির্যাতনই করেনি, বরং মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদেরও তুলে নেওয়ার হুমকি দিত। মাসুদের মতো অপরাধীদের এই পরিণতি সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে চিরকাল টিকে থাকা যায় না, মাসুদের পতন তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। কেবল মাসুদ নয়, তার পেছনের মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তিনি।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে যাদের নামই আসুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় থাকলে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের টর্চার সেল কালচার গড়ে তোলার সাহস পাবে না। ‘টর্চার সেল’ হয়তো মাসুদের দাপটের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, কিন্তু সেটিই শেষ পর্যন্ত তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর নিজের ঔদ্ধত্যে ভরা কণ্ঠস্বর, যা দিয়ে তিনি মানুষকে ভয়  দেখাতেন, সেই শব্দগুলোই আজ আদালতের কাঠগড়ায় তাকে অপরাধী প্রমাণ করতে যথেষ্ট। অন্ধকার জগতের এই খলনায়কের পতন এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয়ে আনার পর তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব তিনি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। সেনাশাসিত সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মানবপাচারের বিষয়েও তাকে একাধিক প্রশ্ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, নিজাম হাজারীসহ একটি বিশাল সিন্ডিকেট শ্রমবাজাার নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। যদিও লোটাস কামাল ও নিজাম হাজারী দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালের জুনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত সেই দায়িত্বে রাখে। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তা। ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান  লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীই মূলত সবকিছু পরিচালনা করতেন। সেনাশাসনের সময় তার ইঙ্গিতে সবকিছুই হয়েছে। গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটিও পরিচালনা করতেন তিনি। ওই কমিটির নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও আটক করা হয়। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদেরও তুলে নিয়ে নির্যাতনের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন তিনি। ব্যবসায়ীদের থেকে টাকা আদায়েরও অসংখ্য অভিযোগ আছে। এমনকি বিপুল অর্থে অস্ট্রেলিয়ায় বিশাল অট্টালিকা রয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য এসেছে, রহস্যজনক কারণে গত অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলেও তিনি প্রভাব বলয়ে ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী প্রভাবশালীদের বেশির ভাগই যখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, তখনো তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। এমনকি মানবপাচার মামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গত সরকারের একজন প্রভাবশালী বিশেষ সহকারীর শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষ সহকারীর সুপারিশে সিআইডি তার নাম বাদ দিয়ে ফাইনাল প্রতিবেদন দাখিল করতে বাধ্য হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে ফাইনাল প্রতিবেদন গ্রহণ না করে পুনরায় তদন্ত করার নির্দেশ দেয় আদালত। পরে ডিবির একটি টিম মামলার তদন্ত করে মানবপাচারের সঙ্গে মাসুদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায়।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় খুব কম কথাই বলছেন তিনি। কণ্ঠস্বরের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি চুপ থাকছেন। মানবপাচারের সঙ্গেও তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। সিন্ডিকেট করে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তবে তিনি দেশের বাইরে অর্থ পাচারের কথা অস্বীকার করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনের সঙ্গে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সম্পৃক্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত