কয়েক সেকেন্ডেই বদলে গেল একটি পরিবারের জীবন। বাসের পেছনের দ্বিতীয় সারিতে জানালার পাশে বসেছিলেন নুরনাহার। পাশে স্বামী দেলোয়ার হোসেন। তার কোলে ছিল তিন বছরের একমাত্র ছেলে ইসরাফিল। স্বাভাবিক এক যাত্রা, ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরা। কিন্তু দৌলতদিয়ার ঘাটে পৌঁছেই সেই যাত্রা থেমে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। গত বুধবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়।
হঠাৎ ধাক্কা। পেছনের যাত্রীরা সামনে ছিটকে পড়েন। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাস তলিয়ে যেতে শুরু করে। এই সময়ই ঘটে দুর্ঘটনা। আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না সন্তানকে বাবার কোলে থাকা ইসরাফিল হঠাৎ হাত ফসকে পানির নিচে হারিয়ে যায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে বসে আহাজারি করছিলেন নুরনাহার। তিনি বলেন, ‘বাস তলিয়ে যাওয়ার সময় সবাই ভেতরে ঘুরতেছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। আমি কীভাবে বের হইছি জানি না, শুধু চিৎকার শুনছিলাম।’
ঘটনার কিছুক্ষণ পর তিনি পানির ওপর ভেসে ওঠেন। সেখানে থাকা কয়েকজন তাকে দড়ি দিয়ে টেনে তোলে একটি নৌকায়। তখনো তার চোখ শুধু ইসরাফিলকেই খুঁজছিল।
‘নৌকায় উঠে স্বামীকে পাইছি, কিন্তু ছেলেকে আর পাইনি’, কাঁদতে কাঁদতে বলেন তিনি।
দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ছেলে আমার হাত ধরে ছিল। পানি ঢোকার পর সবাই ঘুরতে ঘুরতে তলিয়ে যায়। একসময় ছেলে হাত থেকে ছুটে যায়। সে ডাক দিছিল, এরপর আর কিছু মনে নাই।’
নিজেও কীভাবে বেঁচে উঠেছেন, সেটাও জানেন না তিনি। চোখ খুলে দেখেন, একটি ছোট নৌকায় আছেন অন্যরা তাকে টেনে তুলেছে। কিন্তু তার কোল তখন শূন্য।
নুরনাহারের বাবার বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। স্বামী দেলোয়ার ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ঈদের ছুটি শেষে পাংশা বাসস্ট্যান্ড থেকে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন স্বপ্ন ছিল, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ফেরার পথেই হারিয়ে গেল তাদের একমাত্র সন্তান।
