মধ্যপ্রাচ্যের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ইরানে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। যুদ্ধের জেরে জ্বালানির সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবায় কাটছাঁট এনেছে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পত্রিকা এনহান দান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান পরিষেবা সংস্থা ভিয়েতনাম এয়ারলাইনস অভ্যন্তরীণ সাতটি রুটে ফ্লাইট পরিষেবা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, বিমানে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে ২০০ ডলারে উন্নীত হয়, তাহলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করবে ভিয়েতনাম। জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ১২ থেকে ২৬ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ৪ থেকে ১৮ শতাংশ বাতিলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভিয়েতনামের দুই বেসরকারি বিমান পরিষেবা সংস্থা প্যাসিফিক এয়ারলাইনস এবং ভিয়েতজেট এয়ারলাইনসও তাদের ফ্লাইট কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে। এনহান দানের প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী এপ্রিল থেকে প্যাসিফিক এয়ারলাইনস নিজেদের সক্ষমতার তুলনায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ এবং ভিয়েতজেট এয়ারলাইনস ১৮ শতাংশ ফ্লাইট পরিষেবা হ্রাস করছে।
বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটে ফিলিপাইনে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এর প্রতিবাদে শুক্রবার দেশটির রাজধানী ম্যানিলা জুড়ে বিক্ষোভ করেছে শত শত মানুষ। ফিলিপাইনের পরিবহন ইউনিয়নগুলোর ডাকা দুদিনের দেশব্যাপী ধর্মঘটের অংশ হিসেবে এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিপাইনে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বিক্ষোভকারীরা শহর প্রদক্ষিণ করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের অভিমুখে যাত্রা করে। এ সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রাসাদের সামনে ব্যারিকেড দিয়ে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাঁচ সন্তানের জনক এবং জিপনি (স্থানীয় গণপরিবহন) চালক মাইকেল ল্যাবোর নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, দিনে আমার আয় ৫০০ পেসো (৮.২৮ ডলার), যার বেশিরভাগই সন্তানদের স্কুলের খরচে চলে যায়। দিনশেষে খাবার কেনার মতো টাকা হাতে থাকছে না। তেল কোম্পানিগুলো কেন প্রায় প্রতিদিন দাম বাড়াচ্ছে, প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই সেই জবাব দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের এ তীব্র সংকটের কারণে চলতি সপ্তাহের শুরুতে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ফিলিপাইন। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র সতর্ক করে বলেছেন, দেশের জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা এখন ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র সচিব মারিয়া তেরেসা লাজারো জানান, দেশে বর্তমানে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ দিনের পেট্রোলিয়াম মজুদ রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি ভর্তুকি প্রদান এবং পরিবহন খরচ কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া তেলের মজুদদারি, অতি-মুনাফা এবং সরবরাহ নিয়ে কারসাজি ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ফিলিপাইন প্রশাসন। চরম সংকটে পড়া ৪৬ বছর বয়সী আরেক চালক অ্যালান লাস পিনাস বলেন, আগে আয়ের একটা অংশ প্রতিদিন সন্তানদের হাতে দিতে পারতাম, কিন্তু এখন তাদের ধৈর্য ধরতে বলি। আয় কমে যাওয়ায় সব টাকা খাবারের পেছনে চলে যায়, তাই তারা এখন স্কুলের হাতখরচ পাচ্ছে না।
ফিলিপাইনের আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
