গরমে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে সচেতনতা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

গ্রীষ্ম মানেই তীব্র তাপদাহ, ঘাম, ক্লান্তি আর শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি। এ সময়ে শরীরকে সুস্থ রাখা শুধু আরাম নয়, বরং অভ্যাসও। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, সঠিক পোশাক ও জীবনযাপনের কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই গরমের কষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

গরমে কেন শরীর ক্লান্ত হয়

গ্রীষ্মকালকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, কিন্তু কিছু সচেতনতা এ সময়কে অনেকটাই সহনীয় করে তুলতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, পরিচ্ছন্নতা ও জীবনযাপনের সামান্য পরিবর্তনই আপনাকে গরমের ক্লান্তি থেকে রক্ষা করতে পারে। নিজের যতœ নিন, পরিবারের ছোট-বড় সবার প্রতি নজর রাখলেই গরমের দিনগুলোও হয়ে উঠবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক।

গ্রীষ্মকালে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘাম বেশি হয়। এই ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে যায় পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ। যদি প্রয়োজনীয় পানি শরীর না পায় তাহলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, এমনকি হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় র‌্যাশ ও ঘামাচির সমস্যা। তাই এ সময়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে বাড়তি সচেতনতা জরুরি। পানি ও পানীয় জাতীয় খাবার বেশি করে খাওয়া। অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা। প্রয়োজনে বাইরে গেলে ছাতা, স্কার্ফ ব্যবহার করা। সুতির পোশাক পরিধান করা।

গ্রীষ্মে কী কী খাওয়া উচিত

গরমের সময়ে হালকা, সহজপাচ্য ও পানিসমৃদ্ধ খাবার সবচেয়ে উপকারী। মৌসুমি ফল খাওয়া ভালো, বিশেষ করে পানিসমৃদ্ধ ফল  যেমন ডাব, তরমুজ, বাঙ্গি, শসা, পেঁপে, আনারস জাতীয় ফলগুলো শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ এবং শরীর ঠা-া রাখে। এ ছাড়া শাকসবজি লাউ, ঝিঙে, করলা, পুঁইশাক, পালং শাক ইত্যাদি সহজপাচ্য খাবার প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। যা শরীর ঠা-া রাখতে সহায়তা করে। দই ও দইজাত খাবার খাওয়া। দই হজমে সাহায্য করে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে। লাচ্ছি বা দই-চিড়া হতে পারে ভালো বিকল্প। ডাবের পানি পান করা। প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে ডাবের পানি গরমে অত্যন্ত উপকারী। শরীরের পানির ঘাটতি দ্রুত পূরণ করে। এ ছাড়া লেবুর শরবত পান করা যেতে পারে। কারণ লেবুতে থাকা ভিটামিন সি শরীরকে সতেজ রাখে এবং ক্লান্তি দূর করে।

গরমের সময় বেশি প্রোটিন না খেয়ে হালকা প্রোটিন জাতীয় খাবার ডাল, মাছ, ডিম এগুলো পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। অনেক তেল-মসলাযুক্ত মাছ মাংস না খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরমের সময়। গরমের সময় ‘কোন বেলায় কী খাওয়া উচিত’ সেটা ঠিকভাবে মেনে চললে শরীর অনেক বেশি সুস্থ ও সতেজ থাকে।

সকালের নাশতায় : সকালে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। যেমন ওটস, দই, কলা, আপেল, সেদ্ধ ডিম, লাল আটার রুটি। এক গ্লাস পানি বা লেবুর শরবত দিয়ে দিন শুরু করলে শরীর ফ্রেশ থাকে।

দুপুর : দুপুরে একটু ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খেতে হবে, তবে খুব ভারী নয়। যেমন ভাত, ডাল, সবজি, মাছ বা মুরগি, সঙ্গে সালাদ (শসা, টমেটো)। একটু দই খেলে হজম ভালো হয় এবং শরীর ঠান্ডা থাকে।

বিকেলের নাশতা :

বিকেলে হালকা কিছু খাওয়া ভালো। যেমন তরমুজ, বাঙ্গি, ফলের সালাদ, চিড়া-দই, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত। এগুলো শরীরকে ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখে।

রাতের খাবার : রাতে খুব হালকা খাবার খাওয়া উচিত। যেমন রুটি, সবজি, ডাল, হালকা মাছ বা স্যুপ। রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত ২ ঘণ্টা আগে খেলে ভালো।

কী খাবার এড়িয়ে চলা উচিত

গ্রীষ্মে কিছু খাবার শরীরের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। অনেক সময় হজমে সমস্যা করে। যেমন অতিরিক্ত তেলযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার, ফাস্টফুড ও প্রসেসড খাবার, অতিরিক্ত মসলা ও ঝালযুক্ত খাবার, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত চা-কফি (ডিহাইড্রেশন বাড়ায়)। রাস্তার পাশে খোলা খাবার, শরবত খাওয়া থেকে বিরত থাকা। বাসি খাবার এড়িয়ে চলা।

গোসল কতবার ও কীভাবে

অনেকে আছেন গরমের সময়টাতে দিনে কয়েকবার গোসল করেন। গরমে গোসল শুধু আরামের জন্য নয়, স্বাস্থ্যরক্ষার অংশ। দিনে অন্তত ২ বার গোসল করা ভালো। বাইরে বেশি সময় থাকলে ৩ বারও করা যেতে পারে। খুব ঠান্ডা পানি নয়, হালকা ঠান্ডা বা স্বাভাবিক পানি ব্যবহার করুন। ঘাম ঝরার পর দ্রুত গোসল না করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গোসল করুন। সাবান ব্যবহার করুন, তবে অতিরিক্ত নয়। এর ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।

গরমে কেমন পোশাক পরা

পোশাক নির্বাচনও গরমে স্বস্তির বড় অংশ। হালকা রঙের পোশাক যেমন সাদা, হালকা নীল, প্যাস্টেল রঙ বেছে নিতে পারেন। ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক হলে ভালো। বিশেষ করে সুতি কাপড় সবচেয়ে ভালো ঘাম শুষে নেয়। সিনথেটিক কাপড় এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে যে ধরনের পোশাক দিয়ে বাতাস কম চলাচল করে। বাইরে গেলে ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন। সঙ্গে অবশ্যই পানির বোতল রাখবেন।

শিশুদের য

গরমে শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, তাই বাড়তি যতœ প্রয়োজন। শিশুকে পর্যাপ্ত পানি বা তরল খাবার দিন। বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুকে বারবার দুধ দিন। প্রসূতি মা গরমের এই সময়টাতে খাবারের ব্যাপারে সচেতন থাকুন। শিশুকে হালকা পোশাক পরান। শিশুর শরীরে ঘাম জমতে দেবেন না। প্রয়োজনে কয়েকবার পোশাক পাল্টে দিন।

বয়স্কদের যত্ন

বয়স্করা গরমে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ তাদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বল। নিয়মিত পানি পান করাতে হবে। ভারী খাবার এড়িয়ে হালকা খাবার দিতে হবে। দুপুরের তীব্র গরমে বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করুন। প্রয়োজন হলে ঘরে ফ্যান বা কুলিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।

পানি কতটুকু পান করবেন

গরমে শরীর সুস্থ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। প্রতিদিন কমপক্ষে ২.৫ থেকে ৩ লিটার পানি পান করা উচিত। তবে কারও কারও শরীরে পানির চাহিদা একেক রকমের। অতিরিক্ত ঘাম হলে আরও বেশি পানি পান করতে হবে। আবার কিডনির সমস্যা থাকলে পানির পরিমাণ ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী পান করতে হবে। শুধু পানি নয়, শরবত, ডাবের পানি, ফলের রসও উপকারী। একবারে বেশি পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পান করা ভালো। ফ্রিজের অতিরিক্ত ঠা-া পানি পান করা থেকে বিরত থাকুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত