বেসরকারিভাবে সার আমদানি বন্ধ হচ্ছে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

মজুদ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে নন-ইউরিয়া সার আমদানিতে বেসরকারি খাতের ওপর ভর করেছিল সরকার। এখন সক্ষমতার কথা না ভেবেই ও পূর্ব প্রস্তুতি না নিয়েই এই নির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনতে চাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আগামী অর্থবছর (২০২৬-২৭) থেকে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে নন-ইউরিয়া সার আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এমন সময়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, যখন ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের বৈশি^ক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ এ সংকটের বাইরে নয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার আয়োজনে গত ৮ মার্চ কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের উপস্থিতিতে এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদের সভাপতিত্বে সারের ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে যে সভা হয়েছে, তাতে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরিয়া, নন-ইউরিয়া সার আমদানি এবং সরবরাহবিষয়ক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার আলোচনা হয়নি, এ-বিষয়ক সিদ্ধান্তও হয়নি। অথচ যুদ্ধের সময় সার সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, চারটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটিতে বলা হয়েছে, যৌক্তিকতা বিবেচনা করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বেসরকারি পর্যায়ে নন-ইউরিয়া সার আমদানি করা হবে না। সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় সার-বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটির অনুমোদন গ্রহণ করবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম সভায় বলেন, ‘দেশের চাহিদার মধ্যে ইউরিয়া সার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে এবং নন-ইউরিয়া সার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বিসিআইসি ও বেসরকারি পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়। বিএডিসি জিটুজি পদ্ধতিতে এবং বেসরকারি পর্যায়ে টেন্ডারের মাধ্যমে নন-ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। সার সংরক্ষণে বিএডিসির পর্যাপ্ত গুদাম না থাকায় আমদানি খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি পর্যায়ে সার আমদানি করতে হয়। সংরক্ষণাগার নির্মাণ সাপেক্ষে বেসরকারি পর্যায়ে সার আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে।’

সভার শুরুতে সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম মজুদ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তবে মজুদের বিস্তারিত তথ্য এবং তার বক্তব্য কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ অনুবিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন এই অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব। চলতি বোরো এবং গত দুটি আমন ও বোরো মৌসুমে সারা দেশে বাড়তি দাম দিয়ে ডিলাররা সার বিক্রি করলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি এসব কর্মকর্তা। বরং সার সরবরাহ পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে তারা সার আমদানিতে ও সরবরাহে জটিলতা তৈরি করতে পারেন বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বিএডিসির সার নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সরকার চাহিদার সব সার বিএডিসির মাধ্যমে চাইলেই আমদানি করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিএডিসির ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মজুদের ক্ষমতা বাড়ানো। এই ঘাটতি রেখে সরকার এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে হিতে বিপরীত হতে পারে এবং সরকারই বেকায়দায় পড়তে পারে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বেসরকারি আমদানিকারক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি আমদানিকারকরা প্রতিবছর ৯ লাখ টনের বেশি সার সরকারকে সরবরাহ করে। সরকারি আমদানি ঝুঁকিতে পড়লেও বেসরকারি আমদানিকারকরা সবসময় সরকারকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার চাইলে বিএডিসির মাধ্যমে আমদানি করতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা কতটুকু, সেটিও যাচাই করতে হবে। হুট করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাচ্ছে কি না, সেটিও ভেবে দেখা উচিত।’

জানা গেছে, সারা বছর দেশে ইউরিয়া, নন-ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। ২৬ লাখ টন ইউরিয়া ও বাকিগুলো নন-ইউরিয়া। বর্তমানে বিএডিসির অধীনে ৯৮টি সাধারণ সার সংরক্ষণাগার এবং ৪৬টি পিএফজি সার সংরক্ষণাগার রয়েছে। এসব সংরক্ষণাগারের সম্মিলিত স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ৮০ লাখ টন এবং সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ৬ দশমিক ৫০ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র সাড়ে ৬ লাখ টন ধারণক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রায় ৪০ লাখ টন সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

ইউরিয়া, নন-ইউরিয়া সারের বড় হাব হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে, যা শঙ্কা তৈরি করেছে আসন্ন আমন মৌসুম নিয়ে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের কাছে জুন পর্যন্ত চলার মতো সারের মজুদ রয়েছে। অর্থাৎ বোরো মৌসুম শেষ করতে পারলেও আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য মজুদের ঘাটতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহ করা এখন বেশ কঠিন।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে চীন ও রাশিয়া বড় সার সরবরাহকারী। কিন্তু চীন নিজের মজুদ বাড়াতে ব্যস্ত, আপাতত সার রপ্তানি করছে না। রাশিয়া থেকে সারের আমদানিতে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এজন্য আমেরিকার অনুমতি লাগবে। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি করতে হলে লাগবে ইরানের অনুমতি। শত্রু দেশ থেকে সার আমদানিতে ইরান অনুমতি দেবে কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়। এমতাবস্থায় মরক্কো থেকে সার আমদানির কথা ভাবছে বিএডিসি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান মজুদ দিয়ে জুন পর্যন্ত চালানো যাবে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং বিকল্প দেশগুলো থেকে আমদানি করতে না পারলে আমনে সার-সংকটের শঙ্কা রয়েছে।’

সংকটের শঙ্কা বিসিআইসি চেয়ারম্যানের

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই সভার আলোচনায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান ইরান যুদ্ধের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু না বললেও জুনের পর সংকটের আশঙ্কার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে বিসিআইসির ইউরিয়া সারের উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ ভালো। সৌদি আরব থেকে ১৭টি লটের সব কয়টি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাঁচটি লটের চারটি লটের ইউরিয়া সার ইতিমধ্যে আমদানি হয়েছে। বর্তমান ইউরিয়া সারের মজুদে জুন পর্যন্ত চলবে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাস স্বল্পতার কারণে বর্তমানে চারটি ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে ইউরিয়া সার নিয়ে সমস্যা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

বিএডিসির সক্ষমতা ও আমদানি

সভায় বিএডিসির মহাব্যবস্থাপক (সার ব্যবস্থাপনা) জানান, বর্তমানে বিএডিসির মোট সার মজুদের পরিমাণ প্রায় ১১ দশমিক শূন্য ৪ লাখ টন। বিএডিসির বিভিন্ন গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন ও ৫ দশমিক ৩৩ লাখ টন সার পরিবহনাধীন। তিনি জানান, বর্তমানে বিএডিসির অধীনে ৯৮টি সাধারণ সার সংরক্ষণাগার এবং ৪৬টি পিএফজি সার সংরক্ষণাগার রয়েছে। এসব সংরক্ষণাগারের সম্মিলিত স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ৮০ লাখ টন এবং সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ৬ দশমিক ৫০ লাখ টন।

এ ছাড়া ৩৪ হাজার ৮০০ টন সাধারণ ধারণক্ষমতার ১৪টি পিএফজি সার সংরক্ষণাগার নির্মাণাধীন রয়েছে। আগামী জুন মাসের মধ্যে চারটি সার সংরক্ষণাগারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার টন সার সংরক্ষণ করা যাবে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিএডিসির ১ দশমিক ৬২ লাখ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৬১টি সার সংরক্ষণাগার বিসিআইসি, খাদ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিএর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেসব আবার বিএডিসির আওতায় ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত