ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে দেশটির বিদ্যুৎ স্থাপনা, তেল কূপ এবং খারগ দ্বীপে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তিনটি দেশের মধ্যস্থতায় নেপথ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনার মধ্যে তিনি এ হুমকি দিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি গতকাল সোমবার বলেন, ‘বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো কারণে শিগগিরই চুক্তি না হয়, যা সম্ভবত হবে এবং যদি হরমুজ প্রণালি ব্যবসার জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তবে আমরা ইরানের ক্ষেত্রে “সুন্দর থাকা” শেষ করব। তাদের সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তেল কূপ এবং খারগ দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেব।’
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি করার জন্য ইরানের ওপর চাপ চাড়াতে ট্রাম্প এ হুমকি দিলেন।
ট্রাম্পের এমন হুমকির পর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করতে পারে এ খবর দাম চড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির জন্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা হস্তান্তরসহ ১৫ দফা দাবি দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব স্থাপনসহ ছয় দফা দাবি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং একটি চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ক তৎপর রয়েছে।
ইরান বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সরাসরি’ আলোচনা হওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই গতকাল বলেছেন, তেহরান এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা করেনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবকে অযৌক্তিক বলেও উল্লেখ করেন।
ইসমাইল বাগাই অবশ্য বলেন, ইরানের কাছে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যে বার্তাগুলো এসেছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় আগ্রহী। তিনি দাবি করেন, ইরানের অবস্থান স্পষ্ট; আর যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান পরিবর্তন করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে এ যুদ্ধের সূচনা করে। হামলার জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোয় থাকা আমেরিকার ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা করছে ইরান।
যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না : ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এবারকার যুুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গতকাল সাংবাদিকদের লন্ডনে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয় এবং আমরা এতে জড়িয়ে পড়ব না।’ তবে তিনি বলেন, ব্রিটিশ নাগরিকদের জীবন ও স্বার্থ রক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র দেশগুলোর সুরক্ষায় লন্ডন শুধু ‘প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ’ নিচ্ছে।
সরাসরি সেনা না পাঠানোর ঘোষণা দিলেও কৌশলগতভাবে এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যুক্তরাজ্য। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোয় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে স্টারমার সরকার। এ ছাড়া ইরানের ছোড়া ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হয়েছে।
স্পেন আকাশসীমা বন্ধ করল : স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিতা রোব্লেস গতকাল রাজধানী মাদ্রিদে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানে অভিযানের জন্য স্পেনের সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারবে না। স্পেনের এই অবস্থানের ফলে আমেরিকার সামরিক বিমানকে ভিন্নপথ ব্যবহার করতে হবে। স্পেন অবশ্য জানিয়েছে, জরুরি ফ্লাইটগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
হামলা অব্যাহত : আলোচনার জন্য নেপথ্যে তৎপরতা ও ইরানে স্থল হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির মধ্যে বিবদমান তিন রাষ্ট্র প্রতিপক্ষের স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্র তিনটি ছাড়াও কিছু দেশ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি সামনে রেখে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটির ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শিল্পাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এর ফলে সেখানে থাকা একটি তেল শোধনাগারে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল এবং ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, হাইফা এলাকার একটি তেল শোধনাগারের ওপরে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়েছে। এ স্থাপনাটিতে যুদ্ধ শুরুর পরই একবার হামলা চালানো হয়েছিল।
ইসরায়েলের দমকল বাহিনী বলছে, প্রতিহত করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একটি ফুয়েল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আবুধাবি-সময় গতকাল বিকেলের পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশটি ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৭টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪১টি ড্রোন এবং ৪৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এসব হামলায় আমিরাতে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন আটজন; ১৭৮ জন আহত হয়েছেন।
একই সময় বাহরাইনও তাদের আকাশসীমায় আটটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাতটি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে। বাহরাইন প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত ১৮২টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩৯৮টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গতকাল সোমবার ভোরের দিকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এগুলো ড্রোন নয়, বরং বাগদাদ থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আমেরিকার ‘ভিক্টরি বেস’ ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া রকেটের শব্দ।
জানা গেছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এ রকেটগুলো ঠেকাতে পারেনি। রকেটগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ইরাকি স্পেশাল ফোর্সের একটি ‘এ৩২০বি’ পরিবহন উড়োজাহাজে আঘাত করলে সেটিতে আগুন ধরে যায়।
এই প্রথমবারের মতো ভিক্টরি ঘাঁটি সরাসরি হামলার শিকার হলো। তবে বর্তমানে সেখানে কোনো মার্কিন সেনা নেই। তারা আগেই এ ঘাঁটি খালি করে চলে গেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাগদাদে এ হামলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী। কারণ, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের চূড়ান্ত সময়ে এ এলাকাটিকে দেশটির সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত স্থান মনে করা হতো। সেই সংরক্ষিত এলাকাটিই এখন হামলার মুখে পড়েছে।
এ ছাড়া রাতভর বাগদাদের আকাশে আমেরিকার যুদ্ধবিমানগুলোকে চক্কর দিতে দেখা গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি ইসরায়েলের : ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’ গতকাল দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় বাজেট অনুমোদন দিয়েছে। এতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে। যেটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্য ভেঙে নতুন করে পুনর্গঠনের’ সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।
কাতারের রাজধানী দোহাভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, কয়েকটি দেশে সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসন চালানোর মাধ্যমে ইসরায়েল একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি এ কথা বলেন।
তিনি জানান, ইসরায়েলের সবশেষ বাজেট ২৭১ বিলিয়ন (২৭ হাজার ১০০ কোটি) ডলার, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই বিশাল বাজেট থেকেই বোঝা যায় যে ইসরায়েল বিভিন্ন ফ্রন্টে অনেকগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলে হামলায় ২৬১ সেনা ও ছয় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। গত রবিবার বিকেল থেকে পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ২৩২ জন আহত ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কতজন সেনা মারা গেছেন, সেই সংখ্যা ইসরায়েল প্রকাশ করেনি।
নৌ-প্রধান তাংসিরি নিহত হওয়া নিশ্চিত করল ইরান : ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরির নিহত হওয়ার বিষয়টি দেশটি নিশ্চিত করেছে । আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, আঘাতের তীব্রতার কারণে তিনি মারা গেছেন।
