মহাকাশের অসীম শূন্যতায় নক্ষত্রপুঞ্জ যখন কেবলই কৌতূহলের বিষয় ছিল, তখন এক প্রজ্ঞাবান মনীষী সেই রহস্যময় জগতে যুক্তির আলো জ্বেলেছিলেন। সেই সময়ে তার প্রতিটি পর্যবেক্ষণ ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য একেকটি মাইলফলক। তিনি গণিতের জটিল সমীকরণে মহাবিশ্বের এক নিখুঁত মানচিত্র এঁকেছিলেন। তার চিন্তাধারার গভীরতা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের নতুন পথ দেখিয়েছিল, যা তাকে ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় স্থান করে দিয়েছে। তিনি আল-বাত্তানি। তার পূর্ণ নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে জাবির ইবনে সিনান আল-বাত্তানি। আনুমানিক ৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের আগে মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) হাররান নগরীতে তার জন্ম। তার পরিবার ছিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে দক্ষ, যা হয়তো শৈশব থেকেই তাকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার সবচেয়ে চমকপ্রদ অবদান ছিল সৌরবর্ষের সময়কাল নির্ণয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই তিনি গণনা করেছিলেন যে, এক সৌর বছর ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের সমান। বর্তমান যুগের অতি সূক্ষ্ম পরিমাপের সঙ্গে তার সেই গণনার পার্থক্য ছিল মাত্র ২ মিনিট ২২ সেকেন্ড, যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে অকল্পনীয় এক সাফল্য।
তিনি ক্লডিয়াস টলেমি প্রবর্তিত ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদের কিছু ভুল সংশোধন করেন এবং সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কিত নতুন প্রামাণিক তথ্য তুলে ধরেন। তার পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রমাণিত হয় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব বছরের বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হয়, যা বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের রহস্য উন্মোচন করে।
গণিতশাস্ত্রেও আল বাত্তানির অবদান অনস্বীকার্য। তিনি গ্রিকদের জ্যামিতিক পদ্ধতির পরিবর্তে ত্রিকোণমিতিক সাইন এবং ট্যানজেন্টের ব্যবহার প্রবর্তন করেন। স্পেরিক্যাল ট্রিগনোমেট্রি বা গোলীয় ত্রিকোণমিতির জটিল সমীকরণগুলো সমাধানে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। মুসলিমদের কিবলার দিক নির্ণয়ের জন্য তিনি একটি বিশেষ গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করেছিলেন, যা দীর্ঘকাল ব্যবহৃত হয়েছিল। তার রচিত কিতাবুল আজ-জিজ মধ্যযুগীয় ইউরোপে বিজ্ঞানের বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
নিকোলাস কোপারনিকাস থেকে শুরু করে টাইকো ব্রাহে, জোহানেস কেপলার এবং গ্যালিলিও গ্যালিলির মতো কিংবদন্তি বিজ্ঞানীরা আল-বাত্তানির গবেষণালব্ধ তথ্য ব্যবহার করেছেন। কোপারনিকাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডি রেভোলিউশনিবাস অরবিয়াম কোয়েলেস্টিয়াম’-এ আল-বাত্তানির নাম ২৩ বার উল্লেখ করেছেন। আধুনিক ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ভাবগুরু হিসেবে গণ্য করেন।
আল-বাত্তানি কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন জ্ঞানের সেই আলোকবর্তিকা, যা প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিজ্ঞানের মধ্যে শক্তিশালী এক সেতুবন্ধ তৈরি করেছিল। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি উত্তর সিরিয়ার রাক্কা শহরে অতিবাহিত করেন এবং সেখানেই তার প্রধান বৈজ্ঞানিক কাজগুলো সম্পন্ন করেন। ৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদ থেকে ফেরার পথে কাসর আল-জিস নামক স্থানে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার