অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমস্যা বিবেচনায় সরকারকে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন, এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মেলন কেন্দ্রে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের জন্য ভাবনা শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এ পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ।
এ সময় তিনি সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো (পে স্কেল); বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা; রাজস্ব আদায় বাড়াতে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করা এবং সরকারি ভর্তুকি বিষয়ে মতামত তুলে ধরেছেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, যেখানে অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের সমস্যা রয়েছে, দায় পরিশোধের সমস্যা রয়েছে সেখানে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এবং সরকারকে সেদিকে যেতে হয়। বাজেট পরিকল্পনাও সেদিকে থাকতে হয়। আমাদের এখন সেদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।
তবে সরকারের এ নীতি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। সে জন্য দুই-তিন বছরের জন্য মধ্যবর্তী বাজেট রূপরেখা তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সংস্থাটির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ, মমতাজুল জান্নাত, নাঈমা জাহান ত্রিশা, সূর্য তালুকদার, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আসির নেওয়াজ খান, মাহদিয়া মাহমুদ তাইমা, প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মালিহা রহমান, জুবায়ের জাহির চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বী পরিস্থিতিতে কীভাবে হচ্ছে এবং কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আগাম কথা বলার জন্য এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
যাই হোক আমরা যে কথা বলতে চাই, সেগুলো শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকারের জন্য নয়। কথাগুলো জনগণের কাছেও পৌঁছানো দরকার। কারণ আমরা নাগরিকদের জন্য কাজ করি। নাগরিকদের সচেতনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয় তৈরি করার জন্য কাজ করি।
নতুন সরকারের বাজেটের চারটি বিষয়ে কথা বলব প্রথমত, কী পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বাজেট আসছে। দ্বিতীয়ত- এবারের বাজেটে মনোযোগের জায়গাগুলো কী হবে অথবা সমস্যার জায়গাগুলো কী। তৃতীয়ত- বাজেটের সামষ্টিক অর্থনীতি কাঠামো অর্থাৎ যারা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। নির্বাচনের আগে তাদের ইশতেহারে সামষ্টিক অর্থনীতির বিষয়ে কী প্রতিশ্রুতি ছিল। চতুর্থত- নতুন বাজেট পর্যন্ত যে পথরেখা, সেটিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করছি, সে বিষয়ে। তবে- আমাদের আলোচনা সরকার গ্রহণ করবে বা করবে না তা ভিন্ন ব্যপার।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যা রয়েছে। আবার কিছু সংস্কার হতে গিয়েও হয়নি। অর্থনীতিতে এমন একটা বিষয় রয়েছে। এসবের মধ্যে কোনো নতুন সরকার এলে- তাকে সংহত হতে বা স্থিতিশীল হতে কিছু সময় লাগে। এ বিষয়গুলো এখনো হয়ে ওঠেনি। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। একই সময়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ এবং যেসব সংস্কার বাকি রয়ে গেছে তা সম্পূর্ণ করার চাপ রয়েছে। কারণ সংস্কারগুলো সরকারের প্রয়োজন রয়েছে। সেটি সুষ্ঠু কর আদায় হোক এবং ব্যয়ের বিষয় হোক। একইভাবে এই সরকার আগের সরকারের মতো বা তারচেয়ে বেশি আর্থিক সম্ভাব্যতার জায়গাটা সংকীর্ণ।
অর্থাৎ খরচ করার ক্ষমতা যদি না থাকে তাহলে- বাজেটের আয়তন, বাজেটের কাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োগ এটা কিন্তু একটা কঠিন অবস্থার ভেতরে পড়ে। শুধু অভ্যন্তরীণ আয় ও ব্যয়ের সমস্য আছে তা কিন্তু না। বৈদেশিক আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। বিদেশের ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়, রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বৈদেশিক সহায়তা এবং দায় শোধ করাসহ ইত্যাদি অনেক বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি নতুন যে সমস্যা তৈরি হয়েছে সেটি হলো ইরান যুদ্ধের কারণে আগের যে সমস্যাগুলো ছিল, তা আরও প্রকট করে তুলেছে। সে জন্য অর্থনীতি আরও বেশি চাপের মধ্যে পড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো এসব পরিস্থিতিতে আমরা কী করব।
একে আমরা বলছি- কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনার দিকে যেতে হবে। বাজেটেও সেদিকে যেতে হবে। তবে গত এক মাসে সরকারের কার্যক্রমে মনে হয়েছে, বিষয়টি সরকারের মধ্যে উপলব্ধি হয়নি। সে জন্য বলছি- যেখানে অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের সমস্যা রয়েছে, দায় পরিশোধের সমস্যা রয়েছে- সেখানে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সে জন্য এখন জরুরি হলো আগামী তিন থেকে চার মাসের জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করা। তবে অর্থনৈতিক কঠোরতা আবার রজনৈতিকভাবে অতটা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে না। সে জন্য আমরা বলছি- মধ্যবর্তী বাজেট রূপরেখা তৈরি করা। এটি তিন বছর মেয়াদি হতে পারে। এর প্রথম বছর কঠোর নীতিটি আসতে পারে। বিগত সরকারের সময়ে এমন বিষয় থাকলেও কার্যকারিতা দেখা যায়নি। যে জন্য তখনকার অনেক পরিসংখ্যানের মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
যাই হোক, এখনকার পরিস্থিতির মধ্যে- উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া (পূর্ববর্তী সরকার থেকে পাওয়া সমস্যা) পরিস্থিতি এবং বৈশি^ক পরিস্থিতি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে মধ্য মেয়াদি পরিকল্পনার জনগণের সামনে দেওয়া দরকার। তা না হলে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করবে। সে জন্য তিন বছর মেয়াদি মধ্যবর্তী বাজেট পরিকল্পনার যে প্রচলিত ধারা সেটিকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল নতুন সরকারের পর্যালোচনা করা দরকার উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন পে স্কেলের দাবি আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে এটি করে গেছে। যেটি নিজে করতে পারেনি, সেটি অন্যের জন্য রেখে গেছে। বিগত সরকার অনেক কিছু এই সরকারের ওপর প্রলম্বিত দায় দিয়ে গেছে। এটি অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। বর্তমান সরকারের উচিত, নিজের মতো করে নতুন করে কমিশন করে এটি পুনর্বিবেচনা করা। এ ক্ষেত্রে আগের বেতন কমিশনের প্রতিবেদন একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রশ্নহীনভাবে প্রস্তাবিত বেতন বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এরপরও বিবেচনা করে একটি যৌক্তিক জায়গায় আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘চুরি করা টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে অর্থ দেশে আনতে হবে।’ সম্প্রতি বিদেশ থেকে ৪৪ কোটি টাকা ফেরত আনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘ছোট অঙ্কের টাকা ফিরছে, কিন্তু বড় অঙ্কের টাকা কেন আসছে না?’
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে পারলে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক শক্তি না থাকায় এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রথম বছরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম বছরে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হলে শেষ বছরে তা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সরকারি ব্যয় ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাহিদা বাড়বে। তাই ভর্তুকির মধ্যে অদক্ষ ও অন্যায্য খাতগুলো চিহ্নিত করে তা পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। পাশাপাশি ধাপে ধাপে নগদ প্রণোদনা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। আসন্ন বাজেটে অর্থসংস্থান বাড়াতে কর ছাড় কমানো, করের আওতা বৃদ্ধি এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান এই অর্থনীতিবিদ।