নিরাপত্তা জোরদারের দাবি পেট্রোলপাম্প মালিকদের

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

দেশ জুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে সংকটের মধ্যেই চলছে অবৈধ মজুদদারি। কারসাজি ঠেকাতে দেশজুড়ে অভিযান চলছে। গতকাল এক দিনে সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হলো।

এদিকে দেশের পেট্েরালপাম্পগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার, সরকারি মনিটরিং বৃদ্ধি ও বিশৃঙ্খলা রোধে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পেট্রোলপাম্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তেলের কোনো স্থায়ী সংকট নেই। তাই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করে সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে সাময়িক চাপ ও ভোক্তাদের মধ্যে আতঙ্কের প্রেক্ষাপটে রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল।

পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে রাতের বেলায় পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ছোট যানবাহনের এই জ্বালানি বিক্রির জন্য সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ডিজেল সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার কথা জানানো হয়েছে, যাতে বাস-ট্রাকসহ গণপরিবহন চলাচলে বিঘœ না ঘটে।

সংবাদ সম্মেলনে পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাতের বেলায় পাম্পগুলোয় নিরাপত্তা-ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতা, হামলা ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় কর্মীরা আতঙ্কে থাকছেন। এমনকি অতীতে পাম্পের ব্যবস্থাপক বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এ অবস্থায় রাতের বেলায় পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি নাজমুল হক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিকভাবে তেল বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই পাম্পে নিরাপত্তা জোরদার করা, পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পাম্পে অযথা হামলা ও মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ট্যাংক-লরিতে পূর্ণ ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তেল সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জানানো হয়েছে, একটি ট্যাংক-লরির ধারণক্ষমতা সাড়ে ৪ হাজার লিটার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কম তেল দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, যদি একটি লরিতে ৪৫০০ লিটারের পরিবর্তে মাত্র ২০০০ লিটার তেল দেওয়া হয়, তাহলে একই পরিবহন খরচ বহন করতে হয়, ফলে খরচ কার্যত দ্বিগুণ হয়ে যায়। এ ছাড়া লরির চেম্বার খালি থাকলে সেখানে চুরি বা অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

পাম্পে তেল থাকা অবস্থায় বিক্রি বন্ধ রাখার অভিযোগের জবাবে প্রযুক্তিগত কারণ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো পাম্পের ট্যাংক পুরোপুরি খালি হয়ে গেলে পরে সেখানে তেল ঢালার সময় এয়ার লক তৈরি হয়। এতে পাইপলাইন পরীক্ষা করে আবার সরবরাহ চালু করতে ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।

এ কারণে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, অনেক সময় ট্যাংকে ২০০-৪০০ লিটার তেল রেখে সরবরাহ বন্ধ করা হয়, যাতে পুরো সিস্টেম অচল হয়ে না যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, আগে যেখানে একটি পাম্পে দৈনিক পাঁচ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো, এখন সেখানে ২০-২৫ হাজার লিটার পর্যন্ত চাহিদা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো পাম্পে আগে ১-১.৫ হাজার লিটার বিক্রি হলেও এখন সেখানে হাজার হাজার মোটরসাইকেলের চাপ তৈরি হচ্ছে। আগে তিন দিনে যে পরিমাণ তেল বিক্রি হতো, এখন তা এক দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এক দিনে ৮৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার : জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে সরকার। ৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় ৩ হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত সোমবার ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়। মামলা হয় ১৯১টি। ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সাতক্ষীরা, গাজীপুর ও চাঁদপুরে একজন করে তিনজনকে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ৬৭ হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল, ৬ হাজার ৪৪৪ লিটার অকটেন ও ১৩ হাজার ৮৫৬ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে এসব অভিযানে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, এ মাসে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৪টি মামলা হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা। কারাদ- পেয়েছেন ১৯ জন। এ পর্যন্ত ডিজেল উদ্ধার হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৫ লিটার। অকটেন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার। পেট্রোল ৬০ হাজার ২ লিটার।

জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদের হিসাব দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এতে বলা হয়, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুদ আছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন। অকটেন রয়েছে ৭ হাজার ৯৪০ টন। পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন। জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন।

নিয়মিত আমদানি ও খালাস প্রক্রিয়া চলমান থাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে বড় ধরনের কোনো সংকট নেই। তবে অবৈধ মজুদ ও বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত