হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরু রবিবার, লক্ষ্য ২ কোটি শিশু

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী রবিবার থেকে মাসব্যাপী এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম নির্বিঘœ করতে এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানিয়ে বলেন, যেসব উপজেলায় হামের প্রকোপ বেশি, সেখানে আগামী দুই দিনের মধ্যেই টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। রবিবার সকাল থেকে সারা দেশে একযোগে এই কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জোট গ্যাভি থেকে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পাওয়া গেছে। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হবে।

৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সীরা পাবে টিকা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ জানান, দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে এই বিশেষ ক্যাম্পেইন হাতে নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ায় তাদেরও এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ তুলনামূলক বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মদ মইনুল আহসান বলেন, ক্যাম্পেইন শুরুর আগে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অভিভাবকদের অবহিত করা হবে। টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক মাইক্রোপ্ল্যান অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এরই মধ্যে টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সিরিঞ্জসহ অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করা হবে। যারা পূর্বে টিকা নিয়েছে, তাদেরকেও এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হবে।

হামে মৃত্যু ১৫ জন : এদিকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত রাজশাহীসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় হামে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরীক্ষিত ৩৩টি নমুনার মধ্যে ১৫টি মৃত্যুর সঙ্গে হামের সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। রাজশাহী অঞ্চলে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় সেখানে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

শিশুমৃত্যু রোধে ‘বাবল সিপ্যাপ’ : হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়াজনিত শিশুমৃত্যু কমাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে আইসিডিডিআর,বি। গতকাল মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ, সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. জুবায়ের চিশতী এবং শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা কমাতে কার্যকর ও সাশ্রয়ী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দ্রুত এ প্রযুক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী, আজ বৃহস্পতিবার থেকেই শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হকের তত্ত্বাবধানে ‘বাবল সিপ্যাপ’ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মইনুল আহসান এই কার্যক্রম সমন্বয় করবেন।

টিকার দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ : এদিকে হামের টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। গতকাল মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিবাদী করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, টিকার অভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে এবং অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নোটিশে আরও বলা হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট করা হবে।

অধিকাংশকে পূর্ণ ডোজ টিকা দেওয়া হয়নি : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে আক্রান্তদের অধিকাংশকেই পূর্ণ ডোজ টিকা দেওয়া হয়নি। জানা গেছে, বুধবার পর্যন্ত শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০ শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ৯নং ওয়ার্ডে ১৭ জন এবং ৮নং ওয়ার্ডে ২৩ জন। যেসব শিশু এখন চমেক হাসপাতালে ভর্তি আছে, তাদের অধিকাংশই টিকাবিহীন বলে জানিয়েছেন ৯নং শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি রোগীদের মধ্যে সাতজনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ৮নং শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. নাছির উদ্দীন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪০ জনের সাতজনের বয়স শূন্য থেকে ৬ মাস, সাতজনের বয়স ৭ থেকে ৯ মাস, চারজনের বয়স ১০ মাস থেকে ১ বছর, ১৩ জনের বয়স ২ থেকে ৫ বছর এবং দুইজনের বয়স ৬  থেকে ১০ বছর। টিকাদানের হিসাব বলছে, পূর্ণ দুই ডোজ টিকা নিয়েছে মাত্র তিন শিশু, যাদের বয়স দেড় বছর, ২ বছর ও ৮ বছর। এক ডোজ নিয়েছে ৯ জন। আর বাকি ২১ শিশু কোনো টিকাই নেয়নি। এর মধ্যে ১৩ জনের বয়স ২ থেকে ৯ মাস এবং বাকিদের বয়স ১০ মাস থেকে ৮ বছরের মধ্যে। গতকাল বিকাল ৩টায় চমেক হাসপাতালের ৯নং শিশুস্বাস্থ্য ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, হামের উপসর্গসহ নানা রোগে আক্রান্ত শত শত শিশুতে ঠাসা ওয়ার্ডটি।

বেড়েই চলেছে প্রাদুর্ভাব : ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২১ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ১৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৪ শিশু, চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে ৮৪ শিশুকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত