উপসাগরীয় অঞ্চলে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে পদত্যাগ করতে বলেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সেনাপ্রধান জেনারেল জর্জকে তার পদ থেকে আগাম অবসরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ৪১তম চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তী সময়ে পেন্টাগন এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় জানায়, জেনারেল জর্জ অবিলম্বে কার্যকর হবে এমন শর্তে অবসরে যাচ্ছেন। এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর তার কয়েক দশকের সামরিক সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
যুদ্ধকালীন এমন সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ, সাধারণত বড় কোনো সামরিক সংঘাত চলাকালে শীর্ষ নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হলো প্রচলিত নীতি। সেই প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। শুধু বলা হয়েছে, জেনারেল জর্জ তাৎক্ষণিকভাবে অবসর নিচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেননি সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারাও; এই নীরবতা জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। প্রথমত- প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিচালনা, কৌশল নির্ধারণ এবং সামরিক অগ্রাধিকারের প্রশ্নে মতবিরোধ ছিল। বিশেষ করে ইরান-সংক্রান্ত সামরিক পদক্ষেপের ধরন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়ত- রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনা। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ এমন একটি সামরিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাচ্ছেন, যারা তার নীতি ও প্রশাসনের অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ‘বিশ্বস্ত’ এবং নীতিগতভাবে অনুগত কর্মকর্তাদের সামনে আনার চেষ্টা থাকতে পারে। তৃতীয়ত- বৃহত্তর পেন্টাগন পুনর্গঠন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং একই সময়ে আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে সরানো বা বদলি করা হয়েছে। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শীর্ষ পর্যায়ে এমন রদবদলের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা সামরিক কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর ইঙ্গিত দেয়। গত বছর পিট হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি শীর্ষস্থানীয় জেনারেল ও অ্যাডমিরালকে বরখাস্ত করেছেন। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন- চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও এই পদক্ষেপের পেছনে কাজ করেছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ঝুঁকিও রয়েছে। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে নেতৃত্ব পরিবর্তন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিলম্ব বা বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি বাহিনীর মনোবল এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, যুদ্ধকালীন নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন কৌশলগত অনিশ্চয়তার বার্তা দিতে পারে। তবে প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, এটি একটি প্রয়োজনীয় কৌশলগত পুনর্বিন্যাস, যার মাধ্যমে চলমান সংঘাতে আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে জেনারেল র্যান্ডি জর্জের বিদায় কেবল একজন কর্মকর্তার পদত্যাগ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব, নীতি এবং যুদ্ধ পরিচালনার ধরনে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বরখাস্ত
সেনাপ্রধান র্যান্ডি জর্জের পাশাপাশি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। পাম বন্ডির কাজ নিয়ে হতাশা এবং যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত তদন্ত সামলানো ইস্যুতে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। বন্ডির জায়গায় নিয়োগ পাবেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ। আগে তিনি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন।