মিয়ানমারে অং সান সূচির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মাত্র সাত দিনের মাথায় জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নির্বাচন আয়োজন করে এক বছরের মধ্যে বেসামরিক শাসনে ফিরে যাবে দেশটি। দিনটি ছিল ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। তবে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে তার সময় লেগেছে পাঁচ বছর। গতকাল শুক্রবার ৬৯ বছর বয়সী সাবেক এই সেনাপ্রধান পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এই পদে বসার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ইতিমধ্যেই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি তিনি তার অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়ে উইন উ-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মিয়ানমারে কয়েক ধাপে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশটির বড় বিরোধী দলগুলো অংশ নিতে পারেনি। সু চির দল বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং অন্য প্রধান প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে সেনাপ্রধান-সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি জয়লাভ করেছে। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল না।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন এটি কেবল নামমাত্র বেসামরিক শাসন। অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো বসা এই সংসদ তার অনুগতদের দিয়েই পূর্ণ। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এক-চতুর্থাংশ আসন এবং নির্বাচনের আগে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব দল ইউএসডিপি তাদের পক্ষে তৈরি করা পরিবেশে অবশিষ্ট আসনের প্রায় ৮০ শতাংশ জিতে নেওয়ায় ফলাফল মূলত পূর্বনির্ধারিত ছিল। এটাকে নির্বাচনের চেয়ে বরং এক ধরনের অভিষেকই বলা যায়। নতুন সরকার গঠিত হলে তাতেও সামরিক কর্মকর্তাদেরই প্রাধান্য থাকবে। মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধ চলার মধ্যে অত্যন্ত সাবধানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। গৃহযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলো বিদ্রোহীদের দখলে চলে গেছে। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাবেক জান্তা প্রধান হ্লাইং- নতুন একটি পরামর্শদাতা পরিষদও গঠন করেছেন। এই পরিষদের কাছে বেসামরিক ও সামরিক সব বিষয়ে সর্বোচ্চ কর্র্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষমতা থাকবে। এক কথায় বলা যায়, সামরিক পোশাক খুললেও ক্ষমতা যেন না কমে সে বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন মিন অং হ্লাইং। মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন বিশ্লেষক অং কিয়াও সো বলেন, তিনি দীর্ঘকাল সেনাপ্রধানের পদটি প্রেসিডেন্টের পদের সঙ্গে বিনিময় করার উচ্চাকাক্সক্ষা লালন করছিলেন এবং তার স্বপ্ন এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
হ্লাইং প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসলেও গত পাঁচ বছর চলা গৃহযুদ্ধে মিয়ানমার এখনো লণ্ডভণ্ড। সু চির দলের অবশিষ্টাংশ এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী মিলে এই সপ্তাহেই জান্তার বিরুদ্ধে একটি নতুন সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠন করেছে। গত সোমবার এক বিবৃতিতে ‘স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ জানিয়েছে, আমাদের লক্ষ্য হলো সামরিক স্বৈরশাসনসহ সব ধরনের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সম্মিলিতভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক ভূখণ্ড গড়ে তোলা। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সক্রিয় হবে, তখন প্রতিরোধ যোদ্ধারা আরও তীব্র সামরিক চাপ ও নজরদারির মুখে পড়বে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দার এই সময়ে বিরোধীদের নিজেদের ঐক্য ও সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও মনে করেন বিশ্লেষক সাই কি জিন সোয়ে। সংকট যত বাড়বে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বজায় রাখাও ততটাই চ্যালেঞ্জিং হবে, মত তার।