লাল-সাদার ছন্দে বৈশাখের পোশাক

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৯ এএম

বাঙালির জীবনে আনন্দ আর ঐতিহ্যের রঙে রাঙানো বিশেষ দিন পহেলা বৈশাখ। এই দিনটিতে নারী, পুরুষ এবং শিশু সবার জন্যই বৈশাখের সাজপোশাকে থাকে আলাদা মাত্রা, আলাদা গল্প। এবারের পহেলা বৈশাখে ফ্যাশন ট্রেন্ডে এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া, সঙ্গে আছে চিরচেনা ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

পোশাকের ভিন্নতা

বৈশাখী ফ্যাশনে দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্য ও ফিউশনের মিশ্রণ। নারীদের জন্য শাড়ি পছন্দের শীর্ষে থাকলেও কামিজ, কুর্তি এবং সুতির গাউনও প্রিন্টের কডসেট ও বেশ নজর কাড়ছে। বিশেষ করে হ্যান্ডলুম ও খাদি কাপড়ের ব্যবহার বেড়েছে, যা গরমে আরামদায়ক এবং পরিবেশবান্ধব। 

মেয়েদের পোশাক : সময় বদলাচ্ছে, ফ্যাশন বদলাচ্ছে, কিন্তু বৈশাখে শাড়ির আবেদন কখনো কমে না। বৈশাখের সকালে লাল-সাদা শাড়ির আবেদন যেন চিরন্তন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই চেনা রঙের বাইরে এসে যুক্ত হয়েছে আরও নানা রঙ। এখন অফ হোয়াইট, ক্রিম, হালকা হলুদ, আকাশি, এমনকি প্যাস্টেল রঙের শাড়িও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কাপড়ের দিক থেকে সুতি শাড়িই সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে। কারণ বৈশাখের গরমে আরামটাই মুখ্য। হ্যান্ডলুম, খাদি, টাঙ্গাইল, জামদানি স্টাইলের শাড়ি এ সময় বিশেষভাবে সমাদৃত। এসব শাড়িতে যেমন আরাম ও স্বচ্ছন্দ দুটোই থাকে। অধিকাংশ ডিজাইনার নকশার ক্ষেত্রে লোকজ মোটিফকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ফুল, পিঠার নকশা, পাখি, আলপনা, গ্রামবাংলার দৃশ্য বেছে নিয়েছেন। ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, হ্যান্ড পেইন্ট ও কাঁথা স্টিচের কাজও এ বছর ব্যাপক জনপ্রিয়তা  পেয়েছে।

বর্তমানে ফিউশন ধারার শাড়িও তরুণীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। প্রি-স্টিচড শাড়ি, বেল্ট দিয়ে পরা শাড়ি, কিংবা ভিন্নভাবে আঁচল সাজানোর ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা শাড়িতে অভ্যস্ত নয়, তাদের জন্য বেশ উপযোগী।

এ বছর বৈশাখের ব্লাউজের ডিজাইনে ব্যতিক্রম নকশা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। হাফ হাতা, সিøভলেস ব্লাউজে নানা ধরনের নকশা রয়েছে। নকশায় হ্যান্ড পেইন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট, ব্লক, হ্যান্ড স্টিচ ও  লেইস ব্যবহার করেছেন। ব্লাউজের গলা বোটনেট, হ্যান্টার নেক, শার্ট কলার ও গোল গলা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রিন্টেড জয়পুরি ও গামছা ব্লাউজও কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন।

 বৈশাখের শাড়ির জন্য বুটিক হাউজ, শপিং মল এবং নন ব্র্যান্ডের শাড়ি দোকানে পাবেন। পাশাপাশি অনলাইনেও এখন অনেক ভালো ভালো কালেকশন পাওয়া যাচ্ছে, যা ক্রেতাদের জন্য কেনাকাটা সহজ করে দিয়েছে।

 বৈশাখে মেয়েদের সাজে শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজও এখন বেশ জনপ্রিয়। সালোয়ার কামিজে দেখা যাচ্ছে হালকা ও আরামদায়ক কাপড়ের ব্যবহার। বিশেষ করে কটন, খাদি, মসলিন ও লিনেন কাপড় বেশি চলছে। গরমের কথা মাথায় রেখে ঢিলেঢালা কাট, এ-লাইন কামিজ, স্ট্রেইট কাট ও পালাজ্জো স্টাইল বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।

তিন পিস সেট কামিজ, সালোয়ার ও ওড়না, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এখন টু-পিস বা ফিউশন স্টাইলও দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ লং কামিজের সঙ্গে প্যান্ট বা পালাজ্জো মিলিয়ে আধুনিক লুক তৈরি করছেন। ডিজাইনে ব্লক প্রিন্ট, বাটিক, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হাতের কাজের সূচিকর্ম বেশ জনপ্রিয়। ফুল, পাখি, আলপনা বা গ্রামীণ মোটিফের ব্যবহার পোশাকে এনে দিয়েছে উৎসবের আবহ। অনেক পোশাকে কাঁথা স্টিচ, কারচুপি, এমনকি ডিজিটাল প্রিন্টও দেখা যাচ্ছে। কিছু ডিজাইনে মিনিমাল কাজ রাখা হচ্ছে, কিছুতে ভারী এমব্রয়ডারি দিয়ে উৎসবের গ্ল্যামার বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ট্রেন্ডে রয়েছে কটন থ্রি-পিস, ব্লক প্রিন্টের কামিজ এবং সিম্পল কিন্তু স্টাইলিশ ডিজাইন। তরুণীদের মধ্যে এ-লাইন ও স্ট্রেইট কাট কামিজের চাহিদা বেশি।

ছেলেদের পোশাক : বৈশাখে ছেলেদের পোশাকের তালিকায় সবার আগে থাকে পাঞ্জাবি। এ ছাড়া ফতুয়া, কুর্তা, কাবলি সেট এবং ধুতি-পাঞ্জাবিও অনেকের পছন্দের তালিকায় থাকে। বর্তমানে তরুণদের মধ্যে শর্ট কুর্তা ও ফিউশন স্টাইলের পোশাকও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আরামদায়ক ও হালকা কাপড়ের দিকে বেশি ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। কটন, লিনেন ও খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবি বেশি জনপ্রিয়। কারণ এসব কাপড় গরমে আরাম দেয় এবং সারা দিন পরা সহজ হয়। ডিজাইনের ক্ষেত্রে সিম্পল থেকে শুরু করে এমব্রয়ডারি, ব্লক প্রিন্ট ও ডিজিটাল প্রিন্ট সব ধরনের বৈচিত্র্য রয়েছে। অনেক পাঞ্জাবিতে কলার, হাতা বা বুকের অংশে সূক্ষ্ম নকশা করা হচ্ছে, যা পোশাককে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

 বৈশাখ মানেই লাল-সাদা এই ঐতিহ্য এবারও অটুট। সাদা পাঞ্জাবির ওপর লাল বা গাঢ় রঙের নকশা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে এর পাশাপাশি হলুদ, কমলা, নীল, সবুজ, মেরুন ও আকাশি রঙও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।

শিশু : শিশুদের ক্ষেত্রে ডিজাইনাররা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন আরাম ও রংয়ের ব্যবহার। ছোটদের জন্য মিনি সংস্করণে শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফ্রক, ধুতি-পাঞ্জাবি সবই পাওয়া যাচ্ছে। হালকা কাপড় ও উজ্জ্বল রঙ শিশুদের পোশাকে এনে দিয়েছে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য।

নকশায় বৈচিত্র্য

ডিজাইনে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে লোকজ মোটিফের ব্যবহার। পাখি, ফুল, গ্রামবাংলার দৃশ্য, আলপনা, পটচিত্র এসব নকশা পোশাকে এনেছে এক অন্যরকম আবেদন। ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হ্যান্ড পেইন্টের কাজও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নারীদের শাড়িতে জামদানি স্টাইলের নকশা, কাঁথা স্টিচ, এমব্রয়ডারি এবং অ্যাপ্লিক কাজ বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। কামিজে দেখা যাচ্ছে লেয়ারিং, কাঁধে বা হাতায় আলাদা ডিজাইন, এমনকি অসমান কাট। পুরুষদের পাঞ্জাবিতে কলার ও কাফে সূক্ষ্ম কারুকাজ, বোতামে কাঠ বা ধাতব উপাদানের ব্যবহার এবং হালকা এমব্রয়ডারি নতুনত্ব এনেছে। শিশুদের পোশাকে ঐতিহ্যবাহী মোটিফের মিশ্রণ বেশ আকর্ষণীয়।

রঙের প্রাধান্য

বৈশাখ মানেই লাল-সাদা এই চিরায়ত রঙের সমন্বয় এবারও রয়েছে। তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রঙ। যেমন হলুদ, কমলা, নীল, সবুজ এবং মাটির রঙ। নারীদের পোশাকে লাল-সাদার পাশাপাশি অফ হোয়াইট, প্যাস্টেল শেড এবং হালকা গোলাপি বেশ জনপ্রিয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাদা, ক্রিম, মেরুন, নীল এবং সরিষা রঙ বেশি দেখা যাচ্ছে। শিশুদের পোশাকে রঙের আধিপত্য সব সময়ই বেশি। যেসব রঙের পোশাক বেশি দেখা যাবে তাহলো হলুদ, আকাশি, সবুজ, কমলা মিলিয়ে যেন রঙের উৎসব।

কোন পোশাক বেশি চলছে

বর্তমানে বেশি চাহিদা রয়েছে হ্যান্ডলুম শাড়ি, ব্লক প্রিন্টের কামিজ এবং কটনের পাঞ্জাবির। আরামদায়ক হওয়ায় কটন ও লিনেন কাপড়ের পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। নারীদের মধ্যে টু-পিস সেট (কুর্তা ও প্যান্ট), ফিউশন শাড়ি এবং গাউন স্টাইলের পোশাকও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পুরুষদের মধ্যে সিম্পল কিন্তু স্টাইলিশ পাঞ্জাবি, বিশেষ করে হালকা এমব্রয়ডারি করা ডিজাইন বেশি চলছে। শিশুদের জন্য ম্যাচিং ফ্যামিলি আউটফিটও এখন বেশ ট্রেন্ডে। যেখানে পুরো পরিবার একই থিমের পোশাক পরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত