বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায়, স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে যে বিতর্ক চলছে- তা একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
শিক্ষা কি কেবল সুযোগ, নাকি এটি শিশুর অধিকার? বাস্তবতা হলো, শিক্ষা বিশেষ সুযোগ বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। এটি প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে, ভতির্তে পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতি শিশুশিক্ষা গ্রহণকে একটি 'বিশেষ সুযোগ' হিসেবে দাঁড় করায়, যা মূলত অধিকারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। লটারি পদ্ধতি চালুর আগে, আমরা ভিন্ন বাস্তবতা দেখেছি। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, এক অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি। যেখানে কোচিং সেন্টারগুলো কোমলমতি শিশুদের দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য, পঞ্চম শ্রেণির বই পড়তে বাধ্য করত। অভিভাবকদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি একপাশে রাখলেও, এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে শিশুদের। মাত্র ৫-৬ বছর বয়সী একটি শিশুকে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পড়াশোনার চাপে থাকতে হয়েছে। অনেক শিশুর জন্য গাড়িতে বসে দুপুর বা রাতের খাবার খাওয়া যেন, নিত্যদিনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। খেলাধুলা, বিশ্রাম বা স্বাভাবিক শৈশব- সবকিছু যেন প্রতিযোগিতার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছিল। ভর্তি পরীক্ষার ভয়, অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং ব্যর্থতার আশঙ্কা- শিশুর মনে গভীর মানসিক চাপ তৈরি করত। ভর্তি পরীক্ষা মানে, শিক্ষাকে 'সুযোগ' হিসেবে দেখা। আর সুযোগ মানেই স্বাভাবিকভাবেই সেখানে প্রতিযোগিতা, বাছাই এবং বাদ পড়ার একটি প্রক্রিয়া। এতে কিছু শিশু এগিয়ে যায়, আর অনেকে পিছিয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থা শিশুর জন্য অমানবিক। অন্যদিকে, শিক্ষা যদি 'অধিকার' হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে। তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, প্রতিটি শিশুর জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ধনী-গরিব, শহর-গ্রামের বৈষম্য দূর না করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
বর্তমানে লক্ষ করছি, কিছু ব্যক্তি লটারি পদ্ধতির বিরোধিতা করে আবার ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা মূলত একটি প্রতিযোগিতামুখী উচ্চ-মধ্যবিত্ত মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করছেন। যেখানে শিক্ষা অর্জনযোগ্য বিশেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ ভর্তি পরীক্ষা থেকে লটারি ও অঞ্চলভিত্তিক (ক্যাচমেন্ট) পদ্ধতিতে আসার পেছনে ছিল সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কারণ- দুর্নীতি রোধ, বৈষম্য হ্রাস, যানজট কমানো এবং শিশুর স্বাভাবিক শৈশব নিশ্চিত করা। লটারি ও অঞ্চলভিত্তিক ভর্তিব্যবস্থা, মানবিক ও অন্তভুক্তিমূলক পথ দেখায়। কারণ এই পদ্ধতিতে শিক্ষাকে সবার জন্য সহজলভ্য ও চাপমুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। লটারি নিশ্চিত করে, ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রতিটি শিশু অর নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। এতে শিশুর যাতায়াত সহজ হয়, নিরাপত্তা বাড়ে এবং মানসিক চাপ কমে। পাশাপাশি 'ভালো স্কুলে ভর্তি' নিয়ে যে অযৌক্তিক অহমিকা তৈরি হয়, সেটি হ্রাস পায়। লটারি পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হলো- এটি বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃ তিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের একই শিক্ষাঙ্গনে নিয়ে আসে। যখন ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার শিশু একসঙ্গে পড়াশোনা করে, তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা ও সম্মানবোধ তৈরি হয়। একটি শিশু কেবল বই পড়ে মানুষ হয় না; সে মানুষ হয় তার চারপাশের মানুষদের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে, ভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে। এই বৈচিত্র্যই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে। এ ধরনের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা শেখে কীভাবে ভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, কীভাবে সহানুভূতিশীল হতে হয় এবং কীভাবে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ভবিষ্যতে কর্মজীবন বা সামাজিক জীবনে এই অভিজ্ঞতা তাদের অনেক বেশি পরিপক্ব ও সক্ষম করে তোলে।
লটারি পদ্ধতির সমালোচকরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে, এতে 'স্বনামধন্য' প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নাকি কমে যেতে পারে। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের মান নির্ভর করে না কেবল তার শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক মেধার ওপর; বরং তা নির্ভর করে শিক্ষকদের দক্ষতা, পাঠদানের মান, পাঠ্যক্রম, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং অবকাঠামোর ওপর। যদি এসব উপাদান সঠিকভাবে বজায় থাকে, তবে শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের মান কমাতে পারে না- বরং তা আরও সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশে ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষে পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংযুক্ত প্রাথমিক শাখায় প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালু হয়। দেখা গেছে, লটারির মাধ্যমে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে অন্যদের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যায় এবং একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি পদ্ধতি কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, বরং লটারি পদ্ধতি ভর্তিতে স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করে। আগে যেখানে সুপারিশ, আর্থিক প্রভাব বা বিশেষ সুবিধার কারণে অনেক শিক্ষার্থী সুযোগ পেত, সেখানে এখন সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। এটি শিক্ষাব্যবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য আমাদের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত, স্কুলের মধ্যে বৈষম্য কমানো, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং একটি যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করা। লটারি পদ্ধতিতে যদি কোনো ত্রুটি বা অসংগতি থাকে, তবে তা সংশোধন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, শিশুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বীকার করা জরুরি যে, লটারি পদ্ধতি একমাত্র সমাধান নয়; বরং এটি বর্তমান বৈষম্যপূর্ণ বাস্তবতায় 'মন্দের ভালো' একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও কার্যকর সমাধান হতে পারে, একটি সুসংগঠিত অঞ্চলভিত্তিক (ক্যাচমেন্ট) ভর্তি পদ্ধতি। যেখানে প্রতিটি শিশু তার নিকটবর্তী মানসম্মত বিদ্যালয়ে পড়ার নিশ্চয়তা পাবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে 'ভালো স্কুলে ঢোকার' জন্য লড়াই করতে না হয়। বরং প্রতিটি স্কুল হয়ে ওঠে 'ভালো স্কুল'। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে লটারি একটি অন্তর্বর্তী ন্যায়সংগত পদ্ধতি, আর ক্যাচমেন্ট একটি কাঙ্ক্ষিত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
লেখক: গবেষক
[email protected]
স্কুলে লটারিতে ভর্তি
বৈষম্য বাড়বে নাকি কমবে?
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৫ এএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
সুমনা সরকার
×
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০