মুরগির খামারে বার্ড ফ্লুর থাবা, উৎপাদন ব্যাহত

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৬ এএম

পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লুসহ নানা রোগের আক্রমণ বেড়েছে। পরিবেশের তাপমাত্রা দ্রুত ওঠানামার কারণে খামারগুলোতে মুরগির মৃত্যুহার বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির খামারে এর প্রভাব এখনো সীমিত পরিসরে থাকলেও সোনালি বা কালার বার্ড হিসেবে পরিচিত মুরগির উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে গেছে বলে খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) সূত্রে জানা গেছে। এদিকে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে সোনালি মুরগির দাম। এক মাসেরও কম সময়ে প্রতি কেজি সোনালি মুরগিতে দাম বেড়েছে অন্তত ১৫০ টাকা।

জানা গেছে, গত এক মাসে পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লুর আক্রমণ বেড়েছে। বার্ড ফ্লুসহ নানা রোগের কারণে হঠাৎ করেই খামারগুলোতে ব্যাপক হারে মুরগি মারা যাচ্ছে। কোনো কোনো খামারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মুরগি মারা যাচ্ছে। তবে ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে এই সমস্যাটা কম হলেও বেশি আক্রান্ত হচ্ছে সোনালি বা কালার বার্ড হিসেবে পরিচিত মুরগিগুলো।

আর এতেই সরবরাহ কমে গেছে। দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে মুরগির দাম। গত ঈদুল ফিতরের আগে সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ঈদের আগমুহূর্তে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার এই দাম ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় উঠে। তবে ঈদের পর হঠাৎ করেই দাম বৃদ্ধি পেয়ে ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতে ৪৪০ থেকে ৪৬০ টাকার মধ্যে প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতারা বলছেন, সোনালির সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তারও দাম চড়া। এ কারণে বিক্রেতারাও অল্প অল্প করে মুরগি বিক্রি করছেন। এ ছাড়া দাম বৃদ্ধির কারণে সোনালি মুরগির ক্রেতাও কমে গেছে।

বাড্ডার মুরগি বিক্রেতা শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একে সোনালির সরবরাহ কম, অন্যদিকে দামও চড়া। প্রতিদিন যেখানে শ-খানেক মুরগি বিক্রির জন্য আনতাম, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২০টার বেশি মুরগি আনতে পারি না। ক্রেতাদের সঙ্গেও দাম নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে।

একই অবস্থার কথা জানিয়েছেন, বাড্ডা, রামপুরা, সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার, কারওয়ানবাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারের বিক্রেতারা। সব বিক্রেতাই অভিযোগ করেছেন সবরাহ সংকটের। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুরগির বাজারে ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় ব্রয়লার মুরগি দিয়ে এবং বাকি ৩০ শতাংশ সরবরাহ আসে কালার বার্ড থেকে।

 এ বিষয়ে জানতে চাইলে খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) এর সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত এক মাস ধরে হঠাৎ করেই খামারগুলোতে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ বেড়েছে। ব্যাপক হারে মুরগি মারা যাচ্ছে এই সংক্রমণে। এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে আমাদের পর্যাপ্ত মেডিসিন বা ভ্যাকসিন থাকার পরও এটাকে ঠেকানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘ব্রয়লারে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবে সোনালি মুরগির খামারগুলোতে কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, কোথাও কোথাও আরও বেশি মুরগি মরছে। এ কারণে বাজারে ব্যাপক সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।’

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমস্যাটা একেবারেই প্রাকৃতিক। খামারগুলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরও এভাবে মুরগি মারা যাচ্ছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল হচ্ছে।

সরসরি বার্ড ফ্লুর সংক্রমণের কথা না বললেও খামারগুলোতে মুরগি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে জাতীয় কারিগরি কমিটি গত মাসের একটি জরুরি সভা করেছে। সভায় খামারগুলোতে ফ্লুয়ের সংক্রমণে মুরগি মারা যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গত ১ এপ্রিল সারা দেশের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের পোল্ট্রি খাতের রোগ নজরদারি জোরদারের নির্দেশনা প্রদান করেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে , সারা দেশে কিছু কিছু পোল্ট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। জেলা-উপজেলায় মুরগির খামারে সার্ভিলেন্স কার্যক্রম জোর করার জন্য কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে। কোনো খামারে মুরগি মারা গেলে নমুনা সংগ্রহ করে স্থানীয় এফডিআইএল/সিডিআইএল এ পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর জন্যও কার্যক্রম শুরু করতে বলা হয়েছে।

ডিএলএসের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবু সুফিয়ান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গামবুরাসহ কিছু রোগের প্রকোপ দেখা গেলেও এখনো আমরা অফিসিয়ালি বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ পাইনি। তবে একটা সংকট তৈরি হয়েছে খামারিপর্যায়ে কিছু মুরগি মারা যাচ্ছে। এর বড় একটি কারণ আসলে দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তন, আবহাওয়ার পরিবর্তন। হঠাৎ হঠাৎ এই তাপমাত্রার পরিবর্তনে নানা রোগের সংক্রমণ বাড়ছে।

তিনি বলেন, এই সংক্রমণগুলোতে মূলত ছোট ছোট খামারিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ তাদের বায়ো-সিকিউরিটি অনেকটা দুর্বল। সেটা জোরদারে কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া আমরা এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছি।

তিনি জানান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে আমরা দাপ্তরিকভাবে জানিয়েছে। যাতে করে আমাদের আমদানিকারক যারা ভ্যাকসিন আনছেন, তারা যাতে দ্রুত চালানগুলো দেশে আনতে পারেন। কারণ ভ্যাকসিনের বড় অংশই আমাদের আমদানিনির্ভর।

জানা গেছে, সরকারিভাবে উৎপাদিত ভ্যাকসিনের পরিমাণ বছরে মাত্র ২৮ কোটি ডোজ। ৪৫০ কোটি ডোজ চাহিদার বাকিটা আমদানি করেই সরবরাহ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত