খেলাপি ঋণের নিয়ম শিথিলের অনুরোধ

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৬ এএম

খেলাপি ঋণের নিয়ম শিথিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অনুরোধ জানিয়েছেন, দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা। গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সময় দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) পক্ষ থেকে লিখিতভাবে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ঋণ ব্যবস্থা বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান।

এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সংকটের চিত্র তুলে ধরে অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) নামিয়ে আনার আহ্বান জানায় এফবিসিসিআই। এ ছাড়া রপ্তানি উন্নয়নের স্বার্থে ইডিএফ ফান্ডের পরিসর ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে নেতারা। এ ছাড়া সব রপ্তানি খাতের জন্য উন্মুক্ত রাখার অনুরোধও জানায় তারা।

এ সময় এফবিসিসিআই প্রতিনিধিদল আমদানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করা, এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তারও দাবি জানায়।

এফবিসিসিআইয়ের লিখত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির মূল্য, জ্বালানি খরচ এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশ করা হয়েছে

ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা : ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার জরুরি। অতীতে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করার আহ্বান।

সুদের হার স্থিতিশীল রাখা : বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে সুদের হার ধীরে ধীরে কমিয়ে এক অঙ্কে (সিঙ্গেল ডিজিট) আনার প্রস্তাব।

ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা : আমদানি-রপ্তানি ও উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি ওভার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব।

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পে নীতিগত সহায়তা : ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ পুনঃতফসিল, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের সময়সীমা ৩ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি : সরকারি ঋণের চাপ কমিয়ে উৎপাদন খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর।

খেলাপি ঋণ কমানো : ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হওয়া উদ্যোক্তাদের পুনর্বাসনে নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি : উৎপাদনকারীদের স্বার্থে স্বল্পমেয়াদি ঋণের মেয়াদ যুক্তিসংগতভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো : প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রণোদনা অব্যাহত রাখা এবং বিদেশগামী কর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব।

ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানে কমিটি : শিল্প খাতের ব্যাংকিং সমস্যা দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব।

গ্রিন ফাইন্যান্সিং : জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে সোলারসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ।

গ্রাহক ঋণসীমা বৃদ্ধি : সিঙ্গেল বোরোয়ার এক্সপোজার লিমিট ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব।

ইডিএফ ফান্ড সম্প্রসারণ : রপ্তানি উন্নয়নের জন্য ইডিএফ তহবিলের পরিমাণ বাড়ানো ও সব রপ্তানি খাতের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান।

এসএমই ও নারী উদ্যোক্তা সহায়তা : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো, হেল্প ডেস্ক চালু করা এবং সহজ শর্তে জামানতহীন ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব।

প্রতিনিধিদলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এসএম ফজলুল হক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম সরকার, বিজিএমইএর পরিচালক মজুমদার আরিফুর রহমান প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত