সুন্দরবন থেকে বারবার লোকালয়ে অজগর—কেন?

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

সুন্দরবনের পাশের জনপদ খুলনার কয়রায় বারবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে অজগর। কখনো বাড়ির রান্নাঘরে, কখনো মুরগির খোপে, আবার কখনো মন্দিরের পাশে কিংবা কৃষিজমির বেড়ায় আটকা পড়ছে এই বন্যপ্রাণী। প্রতিবারই বন বিভাগ ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা সাপগুলো উদ্ধার করে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করছেন। প্রশ্ন উঠছে—কেন বারবার সুন্দরবন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে অজগর?

সর্বশেষ সোমবার (২৪ আগস্ট) কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের পাথরখালী ক্লোজার এলাকা থেকে প্রায় ১০ ফুট লম্বা একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। সাপটির ওজন ছিল আনুমানিক ১১ কেজি। স্থানীয় একটি বাগানের ফেন্সিংয়ে আটকে থাকা অজগরটিকে বন বিভাগ ও ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) উদ্ধার করে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় অবমুক্ত করে।

তবে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের ১৬ জুন কয়রার ৬ নম্বর কয়রা গোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দিরের পাশ থেকে প্রায় ৮ ফুট লম্বা একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ জুন একই উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা পুলিশ ফাঁড়ির পাশের শ্মশান কালীমন্দিরের মাঠ থেকে ৯ ফুট লম্বা অজগর উদ্ধার হয়েছিল।

২০২৫ সালের ৩০ মে কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের একটি বাড়ির মুরগির খোপ থেকেও প্রায় ৮ ফুট লম্বা অজগর উদ্ধার করা হয়। ওই সময় বন বিভাগ ধারণা করেছিল, নিম্নচাপের প্রভাবে সুন্দরবনে উঁচু জোয়ারে পানি ঢুকে পড়ায় খাবারের সন্ধানে অজগরটি লোকালয়ে চলে আসতে পারে।

এরও আগে মহেশ্বরীপুর গ্রামের একটি বাড়ির রান্নাঘর থেকে ১০ ফুট লম্বা অজগর উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। বন বিভাগের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লোকালয়ের বাড়িঘরে হাঁস-মুরগি সহজে পাওয়া যাওয়ায় খাবারের সন্ধানেও অজগর লোকালয়ে ঢুকতে পারে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বিভিন্ন ঘটনায় খাবারের সন্ধান, উপযুক্ত পরিবেশের খোঁজ এবং জোয়ারের পানিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—মানুষের বসতি ক্রমেই সুন্দরবনের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে বন ও লোকালয়ের স্বাভাবিক বিচরণপথ অনেক জায়গায় সংকুচিত হচ্ছে।

সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার নাসির উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অজগরসহ বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসার বিষয়টি শুধু প্রাণী বন থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না; সুন্দরবনের কাছাকাছি মানুষের বসতিও বিস্তৃত হয়েছে। 

অর্থাৎ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় সামনে আসে—প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জোয়ারের পানি, খাবার ও উপযুক্ত আশ্রয়ের সন্ধান এবং বনসংলগ্ন এলাকায় মানুষের বসতি ও কৃষিকাজের বিস্তার। তবে এর কোনটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

কয়রায় কেন বেশি চোখে পড়ছে?

কয়রার বহু গ্রামের পাশেই নদী, খাল ও সুন্দরবন। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের আওতায় খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ রয়েছে এবং খুলনা জেলার অংশেই সুন্দরবনের প্রায় ২ হাজার ৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে।

কয়রার ৬ নম্বর কয়রা, মঠবাড়ি, মহেশ্বরীপুর, উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় অজগর উদ্ধারের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, বন ও লোকালয়ের দূরত্ব অনেক জায়গায় কার্যত খুবই কম। কোথাও নদীর ওপারেই সুন্দরবন, আবার কোথাও ছোট নদী বা খাল পেরোলেই বসতি। ফলে পানি দিয়ে কিংবা তীরবর্তী পথ ধরে অজগরের লোকালয়ে চলে আসা অসম্ভব নয়।

শুধু কয়রা নয়, সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর, বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলা এলাকাতেও অজগর লোকালয়ে ঢোকার ঘটনা ঘটেছে। মোংলায় ১৫ ফুট লম্বা একটি অজগর বাড়ির হাঁস-মুরগির খোপ থেকে উদ্ধার হয়েছিল। বন বিভাগ তখনও খাবারের সন্ধান বা উপযুক্ত পরিবেশের খোঁজকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

শরণখোলায়ও সবজিখেতের জালে আটকে পড়া অজগর উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ধারকারী দলের মাঠ কর্মকর্তা ধারণা করেছিলেন, খাবারের সন্ধান বা উপযুক্ত পরিবেশের খোঁজে সাপটি বন থেকে লোকালয়ে চলে আসতে পারে।

একাধিক ঘটনায় অজগর লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে পড়লেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এখন সেগুলো হত্যা না করে বন বিভাগকে খবর দেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, সচেতনতা বাড়ায় অনেক অজগর প্রাণে বেঁচে যাচ্ছে।

কিন্তু শুধু উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ একই এলাকায় বারবার অজগর উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। ২০২৪ সালে কয়রার মহেশ্বরীপুরে পরপর অজগর উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।

সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু, পরিবেশ ও বন রক্ষায় কাজ করা সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভের সমন্বয়ক মো. হাফিজুর রহমানের মতে, সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে অজগরের আসার প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, কোন মৌসুমে বেশি অজগর আসে তা চিহ্নিত করা, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক বিশ্লেষণ এবং বন-লোকালয়ের সংযোগস্থলগুলো পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।প্রতিবার অজগর উদ্ধার করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হচ্ছে। কিন্তু কেন একই এলাকায় বারবার অজগর আসছে—তার কারণ অনুসন্ধানে কি কোনো দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চলছে? কয়রার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী, নদী-খাল, জোয়ার-জলোচ্ছ্বাস, বনসংলগ্ন মানুষের বসতি এবং পরিবর্তিত পরিবেশ—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় পরিবেশগত প্রশ্ন।

সুন্দরবন শুধু বাঘের আবাস নয়; অজগরসহ অসংখ্য প্রাণীরও নিরাপদ আশ্রয়। তাই লোকালয়ে অজগরের বারবার উপস্থিতিকে শুধু ‘সাপ উদ্ধার’ হিসেবে না দেখে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও বন-লোকালয়ের পরিবর্তনশীল সম্পর্কের একটি সংকেত হিসেবে দেখা এবং এ বিষয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত