দেশে প্রাণীর জন্য প্রথম টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জীবিকা সুরক্ষা এবং পশু-পাখির মাধ্যমে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল মঙ্গলবার আইসিডিডিআর,বি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার হোটেল বেঙ্গল ব্লুবেরিতে প্রাণীর টিকা কার্ড উন্নয়ন পর্যালোচনা কর্মসূচি থেকে এ প্রস্তাব করা হয়।

‘টুগেদার ফর হেলথ : স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই কর্মসূচি বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এটি ‘গাইডেন্স ফর ইফেক্টিভ ভ্যাক্সিনেশন ম্যানেজমেন্ট ফর লাইভস্টক, পোলট্রি অ্যান্ড পেটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্দেশিকার চূড়ান্ত ধাপ, যা সরকারি সংস্থা, ইপিআই, ওষুধ শিল্প এবং প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (প্রশাসন) পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান বলেন, প্রাণীর জন্য আমাদের জাতীয় টিকা উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ শতাংশ। টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছতে পারবে না।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা জিডিপির প্রায় ১.৮১ শতাংশ এবং লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত; এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত। এর বিপরীতে, টিকাদানের হার কম। গ্রামের কৃষকরা মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ নিয়মিতভাবে তাদের প্রাণীকে টিকা দিয়ে থাকেন।

মানুষের জন্য সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর জন্য সমন্বিত জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। সচেতনতার অভাব, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ, দুর্বল শীতলীকরণ ব্যবস্থাপনা, টিকার অনিয়মিত সরবরাহ এবং প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের ঘাটতি, এসব কারণে টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ওয়ান হেলথ-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম ও বার্ড ফ্লু’র মতো সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে, টিকাদানে ঘাটতি থাকলে মানুষ ও প্রাণীউভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রাণীর টিকাদান শুধু প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নয়, এটি পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যকেও সুরক্ষিত করে। টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং উদীয়মান রোগের ঝুঁকিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা জরুরি।

বাংলাদেশ উদীয়মান সংক্রামক রোগের একটি বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জুনোটিক। জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, জীবন্ত পশুপাখির বাজার এবং দ্রুত নগরায়ন সংক্রমণের ঝুঁঁকি বাড়ায়। অ্যানথ্রাক্স, রেবিস এবং বার্ড ফ্লু’র  প্রাদুর্ভাব এই দুর্বলতা বৃদ্ধি করে।

প্রাণীর টিকাদান, শনাক্তকরণ ও রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের অভাব হলো কার্যকর নজরদারি ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা দুর্বল দিক।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইসিডিডিআর,বি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় একটি টিকাদান ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে গবাদিপশু, পোলট্রি ও পোষা প্রাণীর জন্য টিকা কার্ড চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কার্ডে প্রাণীর পরিচিতি, টিকাদানের ইতিহাস এবং সময়সূচি সংরক্ষণ করা হবে, যা টিকাদান কার্যক্রমের নজারদারি ও সমন্বয়কে আরও কার্যকর করবে।

আইসিডিডিআর,বি’র ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ও টিম লিডার ডা. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দেশিকা ও টিকা কার্ড চালু করা হচ্ছে, যা কৃষকদের টিকাদান ট্র্যাক করতে, কভারেজ বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ জোরদার করতে সহায়তা করবে। এতে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে এবং প্রাণিসম্পদের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্য উপকারী হবে।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তাবিত এ কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনা করেন, যেখানে অগ্রাধিকারভিত্তিক রোগের জন্য মানসম্মত টিকাদান সময়সূচি, টিকা কার্ড চালু, উন্নত প্রতিবেদন ও সমন্বয় ব্যবস্থা এবং ওয়ান হেলথ পদ্ধতির আওতায় প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারা একটি সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক প্রাণী টিকাদান ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যা ওয়ান হেলথ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত