অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া ‘ভাইরাস’ দেখা যায় না। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে, এর প্রভাব সবচেয়ে গভীর ও সুদূরপ্রসারী। জীবিত ও জড়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই অণুজীব, নিজে বাঁচতে পারে না; অন্যের কোষে প্রবেশ করে সেখানে বংশবিস্তার করে। এই পরজীবী বৈশিষ্ট্য ভাইরাসকে মানবজাতির জন্য এক অবিরাম হুমকিতে পরিণত করেছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যত প্রাণ কেড়েছে, তার চেয়েও বহুগুণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে ভাইরাসজনিত রোগে। অদৃশ্য হলেও এই শত্রু সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এটি নীরব, দ্রুত বিস্তারশীল এবং বারবার রূপ বদলাতে সক্ষম। ফলে প্রতিরোধব্যবস্থা প্রায় সময় অপ্রস্তুত থেকে যায়। কয়েক বছর আগেই বিশ্ব দেখেছে, কোভিড-১৯ মহামারীর ভয়াবহতা। ২০১৯ সালের শেষ দিকে সূচনা হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক নজিরবিহীন স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে। তখন বিশ্বঅর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় এবং সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। বাংলাদেশও এই সংকট থেকে রেহাই পায়নি। হাসপাতালের শয্যা সংকট, অক্সিজেনের অভাব, চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, একটি অদৃশ্য ভাইরাস কীভাবে একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে একযোগে বিপর্যস্ত করতে পারে।
কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে, ভাইরাসজনিত ঝুঁকি কমার বদলে আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাস সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগ এখন আর নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই; প্রায় সারা বছরই সংক্রমণের ঝুঁকি বিদ্যমান। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাব বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। নিকট ভবিষ্যতে ভাইরাস আক্রমণ, আরও বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে যৌন ও রক্তবাহিত ভাইরাসও নীরবে জনস্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এইডস এখনো একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। হেপাটাইটিস-বি এবং সি দীর্ঘমেয়াদে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে সিরোসিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত স্ক্রিনিং এবং সচেতনতার অভাব এই সংক্রমণকে আরও বিস্তৃত করছে। এসব রোগ ধীরে ধীরে শরীরকে দুর্বল করে; ফলে অনেক সময় রোগ নির্ণয় দেরিতে হয় এবং তখন চিকিৎসা আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে এগুলোকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সম্প্রতি হাম রোগের পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণে এনেছিল। কিন্তু বর্তমানে টিকা গ্রহণে অনীহা, গুজব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে আবারও সংক্রমণ বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, জনস্বাস্থ্যের অর্জিত সাফল্য স্থায়ী নয়; বরং তা ধরে রাখতে হলে অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
শুধু টিকা নয়, প্রয়োজন কার্যকর চিকিৎসা। কিন্তু বর্তমানে ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ওষুধ, যেমন এসাইক্লোভির জাতীয় ওষুধের কার্যকারিতা সীমিত এবং আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। উচ্চমূল্য সত্ত্বেও এগুলো সব ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত সাফল্য দেয় না। প্রশ্ন থেকেই যায় সহনীয় মূল্য, সীমিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং নির্দিষ্টভাবে কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আদৌ কতটা সম্ভব। বিশেষ করে, এইডস ও হেপাটাইটিসের মতো রোগের ক্ষেত্রে নতুন ও কার্যকর ওষুধের আবিষ্কার বহু জীবন রক্ষা করতে পারে। আগামীতে নতুন ভাইরাস উদ্ভবের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ, অর্থাৎ জুনোটিক সংক্রমণ, নতুন রোগের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের বিস্তৃতির ফলে মানুষ ও প্রাণীর সংস্পর্শ বাড়ছে। এর ফলে নতুন ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। ইবোলা, সার্স এবং কোভিড-১৯ এই ধরনের সংক্রমণের উদাহরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘ডিজিজ এক্স’ ধারণার কথা বলছেন। এই অজানা ভাইরাস, ভবিষ্যতে বড় ধরনের মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। এ ধারণা শুধু তাত্ত্বিক নয়; বরং এতে বাস্তব ঝুঁকির প্রবল সম্ভাবনা। কারণ, প্রকৃতিতে অসংখ্য অজানা ভাইরাস রয়েছে, যেগুলোর একটি যেকোনো সময় মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। যে কারণে এই মুহূর্তে কোনো ভাইরাস বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে, সতর্ক এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকা দরকার। জলবায়ু পরিবর্তন ভাইরাস বিস্তারের আরেকটি বড় কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা মশা ও অন্যান্য বাহকের বিস্তার বাড়াচ্ছে। ফলে নতুন অঞ্চলেও রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বরফ গলে যাওয়া অঞ্চলে সুপ্ত ভাইরাস পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশ্বায়ন ও দ্রুত যাতায়াতব্যবস্থাও ভাইরাসের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। এখন একটি সংক্রমণ কয়েক দিনের মধ্যেই মহাদেশ পেরিয়ে যেতে পারে।
কোভিড-১৯ এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা দেখিয়েছে বিশ্ব কতটা আন্তঃনির্ভরশীল এবং একই সঙ্গে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ভাইরাস কেন আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। জিনগত পরিবর্তন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। ভাইরাস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ভাইরাসের নতুন রূপ শনাক্ত করা যায় এবং সেই অনুযায়ী টিকা ও চিকিৎসা কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই প্রযুক্তির সীমিত প্রাপ্যতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেই উল্লেখ করেছি, চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অধিকাংশ ভাইরাসজনিত রোগের জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক। এতে রোগী অনেক সময় নিজে থেকেই সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু জটিলতার ঝুঁকি থেকেই যায়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই প্রয়োজন শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
ভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সম্যক ধারণা প্রায় শূন্যের কোঠায়। অথচ এই বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে একজন আক্রান্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই ভাইরাসবিষয়ক প্রাথমিক ধারণা স্কুল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও প্রস্তুত হয়ে উঠবে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বিজ্ঞান, নীতি এবং সচেতনতার সমন্বয় ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। সময়মতো প্রস্তুতি না নিলে, নতুন ভাইরাসের আগমন কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সূচনা হতে পারে।
লেখক: ওষুধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট
ক্লাসিফায়েড স্পেশালিস্ট আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ