অদৃশ্য ইশারায় চলে থানা

সরেজমিন সোনাগাজী

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই জমজমাট হয়ে ওঠে সোনাগাজী মডেল থানা প্রাঙ্গণ। থানার ভেতরের বিভিন্ন কক্ষে শুরু হয় সালিশি বাণিজ্য। জিডি থেকে শুরু করে অভিযোগ, হামলার মামলা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, রাজনৈতিক ঘটনায় পক্ষ-প্রতিপক্ষকে নিয়ে প্রতিদিনই নিয়মিত চলে সালিশ বাণিজ্য। এসবে  থানার ওসি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল), পুলিশ ইন্সপেক্টরদের পাশাপাশি অংশ নেন থানার নির্ধারিত স্থানীয় অভিজ্ঞ সালিশদার। এতে ভুক্তভোগীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, টাকা ছাড়া কোনো সেবাই মিলছে না এখানে।

সরেজমিন দেখা গেছে, টাকা ছাড়া কিছুই হয় না ওই থানায়। সাধারণ ডায়েরি থেকে শুরু করে অভিযোগ, মামলা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ থানার সর্বক্ষেত্রে টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। পারিবারিক বিরোধ থেকে শুরু করে জমি-সংক্রান্ত ঘটনা, হামলা-মামলা, চুরি-ডাকাতি, মাটি, বালুসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাসিক মাসোহারা আদায় হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর চলে মামলা বাণিজ্য। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মামলার নামে চলে ইন-আউট বাণিজ্য। এসবের পেছনে রয়েছে উপরওয়ালা পয়সাওয়ালারা। থানার উপরের তলায় অফিসে বসনে দুই কর্মকর্তা। একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান এবং অন্যজন ওসি (তদন্ত) শফিকুর রহমান। নিজ কক্ষের সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেন মুমিদ রায়হান। থানার সোর্স খ্যাত সোহাগ নুর, বৈদ্য জাহাংগীর, বাদলসহ একটি দালাল চক্র ও থানার অনুগত কিছু কর্মকর্তার মাধ্যমে বড় অভিযোগ নিজেই তার অফিসে নিয়ন্ত্রণ করেন সার্কেল মুমিদ। প্রতিপক্ষের কেউ তার সিদ্ধান্ত অমান্য করলে চলে হামলা-মামলা ও হয়রানি। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতারা পালিয়ে গেলে সোনাগাজীর দক্ষিণাঞ্চলের চরখন্দকার, আবদুল্লার চর মৌজার হাজার হাজার একর মৎস্য প্রকল্প দখল বাণিজ্য শুরু হয়। সেই দখল বাণিজ্যের অঘোষিত ডন সার্কেল সৈয়দ মুমিদ রায়হান। তার আশীর্বাদ যার কাছে, প্রকল্পও তার কাছে। এ ব্যাপারে প্রকল্প মালিকরা কয়েক দফা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেও বিচার পাননি। উল্টো প্রকল্পের মাছ, মুরগি ও ফলমূল সবার আগে পুলিশ কর্তার বাসায় পৌঁছে যায়। আর্মি আনোয়ার নামে এক প্রকল্প মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প দখল করলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে আমাকে ৫ আগস্টের মামলায় আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সমঝোতার করে বের হই। এ জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও দিতে হয়েছে তাদের। বর্তমানে আমার ভাইকে আবার মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

ফেনী পুলিশ সুপার কার্যালয় জানায়, সোনাগাজী মডেল থানায় ২০২৫ সালে মোট ২৩৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ডাকাতি, ২৩টি চুরি, ছয়টি খুন, ২৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন, পাঁচটি অস্ত্র মামলা, ৪১টি মাদক-সংক্রান্ত, তিনটি সড়ক দুর্ঘটনা ও ১২৩টি অন্যান্য মামলা হয়। নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ২০২৫ সালে ওই থানায় ৩ হাজার ৮৭টি অভিযোগ জমা পড়ে, যার অধিকাংশ অভিযোগের অগ্রগতি হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১৬৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫৩ ও মার্চে ১১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। আর এই সময়ে মামলা হয়েছে মাত্র ৫০টি। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ৩৫৮টি সাধারণ ডায়েরির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২০৩টি। তবে অনেক অভিযোগ প্রভাবশালী দলীয় নেতাদের নামে এলে থানা তা গ্রহণ না করারও অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ৫ অক্টোবর চরখোন্দকার ও চর রামনারায়ণ মৌজার মৎস্য প্রকল্পের খামারিদের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে প্রকল্পের বাঁধ কেটে মাছ লুট করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় সমাধানের কথা বলে বিএনপির এক নেতার মাধ্যমে ২ লাখ টাকা নেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

কিছুদিন আগে সরেজমিন থানায় গিয়ে দেখা যায়, গত ২৭ মার্চ শুক্রবার দিবাগত রাতে উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ভোলাকাজী বাড়িতে গভীর রাতে টিউবওয়েলসহ তিন চোরকে আটক করে পুলিশ। পরে দুইজনের নামে মামলা দিলেও একজনকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এই নিয়ে ক্ষোভ আছে ভুক্তভোগীদের মধ্যে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বগাদানা ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামের তাস খেলার অভিযোগে চারজনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় একটি পাখি শিকারের রাইফেল ও একটি রামদা উদ্ধার করে। পরে তাদের অস্ত্র মামলার ভয় দেখিয়ে আসামি আজাদের আত্মীয়ের কাছ থেকে ৯৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন এএসআই তসলিম। কাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মোকারম হোসেনের মালামালের গাড়িসহ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় ড্রাইবার আবসার উদ্দিন। এই বিষয়ে তিনি গত বছরের ১৪ নভেম্বর থানায় অভিযোগ দিলেও অদ্যাবধি তার কোনো সমাধান পাননি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো ভুক্তভোগী থানায় এলেই প্রথমে তাকে অভিযোগ লিখতে পাঠানো হয় থানার নির্ধারিত রাইটারের কাছে, যাকে দিতে হয় নির্ধারিত ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা। অন্যত্র থেকে লিখে নিলে বিভিন্ন ভুলের অভিযোগ তুলে বাতিল করা হয়। এরপর অভিযোগ দাখিলের জন্য ডিউটি অফিসারকে ২ হাজার টাকা ও সাধারণ ডায়েরির জন্য ১ হাজার টাকা দিতে হয়। অভিযোগ দাখিলের পর তদন্তপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সরেজমিন গেলে তাকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত যাতায়াত খরচ, নাস্তা ও অন্যান্য বাবদ বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষকে দিতে হয়। আবার কিছু ঘটনায় সালিশের মাধ্যমে মীমাংশা করা হয়। সেক্ষেত্রে উভয়পক্ষকে থানায় নিযুক্ত সালিশদার ও কর্মকর্তার জন্য নিধারিত টাকা দিতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, সোনাগাজী উপজেলায় চুরি-ডাকাতি হলেও মামলা হয় না থানায়। চুরি ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে থানায় এলেও আসামি অজ্ঞাত থাকায় মামলা করতে নিরুৎসাহিত করা হয় থানা থেকে। আবার অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করলেও তার ফলাফল অগোচরেই থেকে যায়। কোনো ঘটনার পর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশের সিদ্ধান্তে কেবল অভিযোগ করেই বাড়ি ফিরতে হয় কিন্তু তা আর মামলা হিসেবে গ্রহণ করে না পুলিশ।

‘সোনাগাজী মডেল থানায় সালিশ বাণিজ্য ও চুরি-ডাকাতি হলে মামলা হয় না’ শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরে দুটি সংবাদ প্রকাশের পর গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদকের নামে বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একজন ভুয়া আহতের মামলায় তার নামটি যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ওসি বায়েজিদ আকন্দকে প্রত্যাহার করা হয়। অ্যাডভোকেট মেসবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ডাকাতি ফৌজদারি অপরাধ বা ধর্তব্য অপরাধ। ডাকাতি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ সরাসরি মামলা রেকর্ড করতে ও তদন্ত শুরু করতে বাধ্য। যদি ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগও দেন, এটিকে সরাসরি মামলায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আইনে বলা আছে। কখনো কখনো দেখা যায়, থানায় ভুক্তভোগী মামলা করতে এলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরাসরি মামলা না নিয়ে প্রথমে শুধু লিখিত অভিযোগ নিয়ে দায় এড়িয়ে যান। এর কারণ হতে পারে থানায় মামলার সংখ্যা কম দেখানো, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অপরাধের সংখ্যা কম দেখানো, মামলার তদন্তের চাপ এড়িয়ে যাওয়া কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাব বা সুপারিশ।

সোনাগাজী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, বড় অভিযোগ তদন্ত করে মামলা করা হয়। ছোটখাটো অভিযোগ নিয়ে উভয়পক্ষ বসে সমাঝোতা করা হয়। অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কী করেন, তার ব্যাপার। তারপরও বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখব।

অভিযোগের বিষয়ে থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সোনাগাজী সার্কেল) সৈয়দ মুমিদ রায়হান বলেন, অভিযোগ ও মামলা রের্কড করা ওসি বা থানার কর্মকর্তার দায়িত্ব। চাকরি করতে গেলে এক পক্ষ খুশি হয়, অপর পক্ষ অভিযোগ করবে। অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন এটা কাল্পনিক।

পুলিশ সুপারের পক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাইফুল ইসলাম বলেন, যদি পুলিশের কেউ কোনো অপরাধ বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। যারা অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে মানুষ সুন্দর সেবা পায়, এর মধ্যে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে কোনো ছাড় নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত