বিরোধী দলের বিরোধিতা ও বিতর্কের মধ্যে জাতীয় সংসদে আরও ৩১টি বিল পাস হয়েছে। যদিও বিল পাসের সব প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পর গণবিরোধী বিল পাসের অভিযোগ তুলে ওয়াকআউট করেছিলেন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটবদ্ধ দলের সংসদ সদস্যরা। এদিকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বিল পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী বিরোধিতা করলেও তাদের জোটবদ্ধ নতুন দল এনসিপি তাতে সমর্থন জানিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সকাল-বিকেল দুই সেশনে বিলগুলো পাস হয়েছে।
মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন বিল পাস : বিরোধী দলের আপত্তির মুখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করতে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন, তা সেভাবেই পাস হয়।
এর আগে সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) আপত্তি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। বিলটি পাসের ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রণীত ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার আইন পুনঃপ্রচলন হবে। বিলটি উত্থাপনে আপত্তি তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, আজকে যারা সরকারি বেঞ্চে রয়েছেন, তারা চব্বিশের জুলাইয়ের আগে হলে এই বিল পাসের বিরোধিতা করতেন। এই অধ্যাদেশকে ল্যাপস করার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার কমিশনকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল : বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের বিধান এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জারি করা অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। এগুলো বাতিল করার বিরুদ্ধে ছিল বিরোধী দল। বৃহস্পতিবার বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়। এর মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এ-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে। এর ফলে বিচার বিভাগ আবার আগের অবস্থায় ফিরছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আর কোনো আইন থাকছে না। তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে ২৫ বিচারকের নিয়োগসহ যেসব ব্যবস্থা ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে। আর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং এর সংশোধনী অধ্যাদেশ) বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অধ্যাদেশের অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে ন্যস্ত বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হবে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের জন্য সৃজিত পদগুলো বিলুপ্ত হবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকরি আগে যে আইনে পরিচালিত হতো, আবার সেই আইনের অধীনে ন্যস্ত ও পরিচালিত হবে।
অধ্যাদেশ দুটি বাতিল করতে আনা বিল পাসের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের এই উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। আবারও আগের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অধিকতর যাচাই-বাছাই করে পরে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হবে।
বাংলাদেশে আর কোনো মানিক-খায়রুল চাই নাআইনমন্ত্রী : আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টে ভালো বিচার হোক, আমরা চাই সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক এবং বাংলাদেশের বিচার বিভাগ পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করুক।
নিয়োগ হয়েছে অতীতে, বিশেষ করে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আমলে, নিয়োগে পার্টির ক্যাডারদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে। যে নিয়োগের মাধ্যমে আমার বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে হৃদপি- সুপ্রিম কোর্টের প্রধান, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আক্রমণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা চাই না, বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। আমরা চাই না, বাংলাদেশে আর কোনো খায়রুল হক গজিয়ে উঠুক। আমরা চাই না, আর কোনো বিচার বিভাগীয় কিলিং হোক। আমরা চাইএই বিচার বিভাগ স্বচ্ছ, স্বাধীন ও সক্রিয়তায় ভরপুর হোক।
দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না স্থানীয় সরকার নির্বাচন : স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) নির্বাচনে আবার নির্দলীয় প্রতীক ফিরল। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত পৃথক চারটি বিল পাস হয়। বিলগুলো সংসদে উত্থাপন করা হলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধী দলের আপত্তির মুখে আইনগুলো পাস হওয়ায় এখন থেকে স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রতীক ছাড়া পূর্বের ন্যায় নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বিভিন্ন মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন পাস করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
এদিকে বিলগুলো পাস হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বিলটি পাসের প্রক্রিয়ায় প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যের দেওয়া বক্তব্যের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
জামুকা সংশোধনে বিল পাস, জামায়াতের আপত্তি, এনসিপির সমর্থন : পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে সংশোধন করে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করেছে সংসদ। এতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়। গতকাল সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দিলেও বিলের কোন ধারায় তিনি সংশোধন চান, তা উল্লেখ করেননি। ফলে স্পিকার তার আপত্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ভোট দেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির ওই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) জানিয়ে জামায়াতের এমপিরা বলেছিলেন, জামুকা অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
জামায়াতের এমপিরা এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ ও মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখেন। কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
জারি করা অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, বিএলএফ এবং অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।
জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
আল্লাহ ভালো জানেন একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিলজামায়াত আমির : বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন একাত্তর সালের ওই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহতায়ালা তার নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ ও একমাত্র সাক্ষী। বাকি আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী। কিন্তু আল্লাহতায়ালাই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী।’ গতকাল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল-২০২৬। বিলটি উত্থাপনের আগে সংসদে তা প্রস্তাব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। প্রস্তাবের পর বিলটি নিয়ে কারও আপত্তি আছে কি না জানতে চান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমাদের এই অঞ্চল দুই-দুবার স্বাধীন হয়েছে। সাতচল্লিশে একবার। ২৩ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার। মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশ ও জাতির জন্য বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে লড়াই করেছিলেন, তাদের সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। তবে ‘বুকভারা আশা নিয়ে’ দেশ স্বাধীন হলেও, সেই আকাক্সক্ষা তখনকার শাসকরা পূরণ করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। এ সময় স্বাধীনতার পরপর বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র হত্যা করা হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর তার ধারাবাহিকতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে নিঃসন্দেহে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এর সুফল পরবর্তী পর্যায়ে জাতি পেয়েছে এবং আজকের পার্লামেন্ট সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এ পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিলের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, এই বিলে প্রস্তাবনা করা হয়েছে যে জিনিসটা, স্বাধীনতার পর তখনকার শাসকও (সেটা) আনেননি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান; তিনিও আনেননি। তিনবারের অতিসম্মানীয়া প্রধানমন্ত্রী (খালেদা জিয়া) তিনিও আনেননি। এ জিনিসটা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে এলেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত একজন প্রতিভূ শেখ হাসিনা। এবং পরবর্তী পর্যায়ে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে সামান্য পরিবর্তনসহ।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘কী আছে এখানে? (বিলে) তৎকালীন তিনটা সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে। তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি। পাক সেনাবাহিনীর সঙ্গে, আরও কিছু এনসিলারি ফোর্সের সঙ্গে তিনটা রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে এবং বর্তমান উপস্থাপনা বা প্রস্তাবনায় তৎকালীন এই তিন সংগঠনের কথা বলা হয়েছে।
বক্তব্যের এই অংশে প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা অংশটুকু বিব্রত করে তিনি জানান, তারা চান জনগণের প্রতি দায় এবং দরদ নিয়ে, দেশের প্রতি ভালোবাসা নিয়েএই দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সংগঠন তার কার্যক্রম পরিচালনা করুক।
এই জাতিতে কোনো বিভক্তি চান না মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৯ সালে পলিটিক্যাল পার্টিজ রিভাইভাল অ্যাক্টের মধ্য দিয়ে স্বয়ং আওয়ামী লীগেরও পুনর্জন্ম হয় বাংলাদেশে। এবং সেই সময় যে কয়টি দল ছিল, তারা সবাই রাজনীতি করার এই সুবিধাটুকু বা তাদের অধিকারটুকু তারা ফিরে পান। আমরা সেই সময় তা ফিরে পেয়েছি।’
এ জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করার পাশাপাশি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘আমরা কখনো এটা ভুলে যাইনি। ভুলে যাব না। আমরা সেই দায়-দরদন্ডভালোবাসা নিয়েই ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কর্মকা- পরিচালনার চেষ্টা করছি। আগামীর দিনগুলোতেও আর জাতিকে বিভক্ত নয়, বরঞ্চ ঐক্যবদ্ধ করে আমরা যাতে একটি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্মানের জাতি গঠন করতে পারি, সব দলের এটিই হোক অঙ্গীকার।’
‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ করে বিরোধী দলের ওয়াকআউট : এদিকে ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। এ নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দল তৃতীয়বারের মতো ওয়াকআউট করল। ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। এ জন্য আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।’ এ ঘোষণা দেওয়ার পরই শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন।
বিরোধী দল ওয়াকআউট করার পরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘আমি ধন্যবাদ জানানোর জন্য উঠেছি। আইন প্রক্রিয়ার ফার্স্ট রিডিং, সেকেন্ড রিডিং, থার্ড রিডিংসব প্রক্রিয়ায় উনারা সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ হাত তুলে সমর্থনও করেছেন। সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কি না এটা জানার জন্য উঠেছি। সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ। আশা করি, মাগরিবের নামাজের পর আবারও অংশগ্রহণ করবেন।’ যদিও মাগরিবের বিরতির পর জামায়াত পুনরায় অধিবেশনে অংশ নেয়।
গতকাল আরও ৩১টি বিল পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। এর মধ্যে রয়েছে ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবীকল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬; ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬; ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬; ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬; ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা বিল, ২০২৬; ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল, ২০২৬; ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল, ২০২৬; ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল, ২০২৬; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সংশোধন) বিল, ২০২৬; বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিল, ২০২৬; ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬ ’; ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬; ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ ’; ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল, ২০২৬ ’; ‘বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, একদিনে এর আগে এতসংখ্যক বিল পাসের রেকর্ড নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম কার্যদিবসে ৩১টি বিল পাসের মধ্য দিয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
সংসদের অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করল অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদল : এদিকে অস্ট্রেলিয়ার হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার মিল্টন ডিক এমপির নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের প্রতিনিধিদল গতকাল জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের কাছে সফররত প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির কথা জানান এবং সংসদের সব সদস্যের পক্ষ থেকে তাদের স্বাগত জানান।