বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে এলপিজি

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

জ্বাালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা, ভোগান্তি আর অস্বস্তির মধ্যেই চলতি মাসে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এর ওপরে ইচ্ছেমতো।

অতিরিক্ত দামের বিষয়ে অপাটের, ডিস্ট্রিবিউটর এবং খুচরা বিক্রেতারা একে-অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে নিয়ম রক্ষার মূল্য নির্ধারণ করেই দায়িত্ব শেষ করছে। ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় বন্ধ হচ্ছে না কোনোভাবেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিইআরসি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাবের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি সরবরাহ কম হওয়ায় এ নৈরাজ্য চলছে।

দেশে সরবরাহ করা এলপিজির ৯৮ শতাংশই আসছে বেসরকারিভাবে। মাত্র ২ শতাংশ এলপিজি সরকারিভাবে সরবরাহ হচ্ছে। কিন্তু সরকারি এ এলপিজি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। বর্তমানে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা। দীর্ঘদিন ধরেই এ দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

নিরাপদে ও সাশ্রয়ীমূল্যে এলপিজির ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহারকারীদের সরকার ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি নানারকম তদারকি করে। কিন্তু বাংলাদেশে ন্যূনতম ভর্তুকি তো দেওয়া হয়ই না, এমনকি ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে সরকারি সংস্থাগুলোর যে ধরনের তদারকি দরকার তাও চোখে পড়ে না খুব একটা।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতিমাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে কখনোই এলপিজি বিক্রি হয়না। এ নিয়ে ভোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরও কোনো সুরাহা নেই।

জানতে চাইলে ক্যাবের জ্বাালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, মূলত বিইআরসির অদক্ষতা এবং তাদের জবাবদিহিতার অভাবের কারণেই এলপিজি নিয়ে এ নৈরাজ্য চলছে। তারা নিজেরাই নিজেদের আইন লঙ্ঘন করছে। এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেজন্য কারাদন্ডের বিধান পর্যন্ত আছে। কিন্তু কমিশনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

এসবের প্রতিকার চেয়ে বিগত সরকারের আমলে কমিশনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্যাবের পক্ষ থেকে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান এ জ্বাালানি বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, কমিশনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনেরও সংস্কার জরুরি। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বন্ধ করে কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জিম্মি ভোক্তারা : গ্যাস সংকটের কারণে দেড় দশক ধরে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখেছে সরকার। ফলে রান্নার কাজে ভোক্তাদের বড় অংশই এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। আবার অনেকের গ্যাস সংযোগ থাকলেও ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করছেন।

মূলত বাসাবাড়িতে রান্নায়, কারখানা, বাণিজ্যিক ও গাড়ির জ্বালানি হিসেবে (অটো গ্যাস) ব্যবহার হচ্ছে এলপিজি। গত ৭ বছরে দেশে এলপিজির ব্যবহার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে এখন ১৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে। এলপিজির ৮০ শতাংশই ব্যবহার হয় বাসাবাড়িতে।

আর এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় ভোক্তারাও চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন।

ঢাকার বসিলা এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান জানান, চলতি মাসে তিনি ২ হাজার টাকা নিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন। যা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ২৭২ টাকা বেশি।

প্রতিমাসেই বাড়তি দাম দিয়ে এলপিজি কেনের এমন অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দোকানদারকে সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে তাদের সাফ জবাব নিলে নেন না নিলে কিছুই করার নেই। এভাবে যদি বাড়তি দামেই কিনতে হয় তাহলে বিইআরসি প্রতিমাসে এ দাম কেন নির্ধারণ করছে প্রশ্ন তোলেন মাহবুবুর।

ওই এলাকার ব্যবসায়ী শাহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শাহিন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মার্চে যখন সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪১ টাকা দাম ছিল তখন ১ হাজার ৭০০ টাকা করে এলপিজি বিক্রি করতেন। এখন ২ হাজার টাকা করে বিক্রি করছেন।

বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহিন জানান, ‘আমাদেরই ডিলারদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে নিজের মুনাফা, অন্যান্য খরচ যোগ করলে ২ হাজার টাকার নিচে তো বিক্রি সম্ভব নয়।’

মিরপুরের পল্লবী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান জানান, এ মাসে সরকার দাম নির্ধারণের পর ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে তার।

সার্বিক বিষয়ে জানতে গতকাল বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

তবে এর আগে তিনি বলেছেন, বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তারা পাচ্ছেন। সে অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করছে কমিশন।

এলপিজি নিয়ে এমন চরম নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে অনেক ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করেছে। কিন্তু তাতে দাম নিয়ন্ত্রণে তো আসেনি, উল্টো এর আগে কমিশন বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে ধর্মঘট পালন করেছে এলপিজি বিক্রেতাদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এক পর্যায়ে অভিযান সাময়িক বন্ধ করে পিছু হটে বিইআরসি।

ঢাকার দুজন ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে আলাপকালে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে অভিযোগ করেন, তাদের অপারেটরদের কাছ থেকে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে হয়। এর সঙ্গে নিজেদের মুনাফা ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে খুচরা বিক্রেতার কাছে কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হয়। তবে খুচরা বিক্রেতারা এর চেয়ে বেশি অর্থাৎ সুযোগ বুঝে ইচ্ছেমতো দাম আদায় করে।

কোন কোন অপারেটর বাড়তি দাম নিচ্ছে তার প্রমাণ চাইলে ব্যবসায়িক স্বার্থে তারা তা প্রকাশ করতে রাজি হননি।

লাইসেন্স নেই বেশির ভাগ পরিবেশকের : এলপিজি আমদানি ও বোতলজাত করার জন্য কমিশন থেকে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। যাদের বলা হয় এলপিজি অপারেটর। এর মধ্যে মাত্র ২৭টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এলপিজি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে। এলপিজির গড় মাসিক বাজার ১ লাখ ৩০ হাজার টন। এই বাজারের ৫৫ শতাংশ ব্যবসা রয়েছে ৫টি প্রতিষ্ঠানের হাতে।

অপারেটরদের কাছ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করে ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলরা। সারা দেশে এমন প্রায় ২৫ হাজার পরিবেশক রয়েছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। যদিও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পরিবেশকের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার।

আইন অনুযায়ী বিইআরসি থেকে এদের নিবন্ধন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাত্র ১৩ জন পরিবেশক ছাড়া লাইসেন্স নেই কারোরই। আবার ১১ হাজারের বাইরে যেসব খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন তাদেরও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেই। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পরিবেশকদেরও লাইসেন্স নিতে হবে। এসব ব্যবসায়ীর বেশির ভাগই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সিলিন্ডার পরিবহন ও বিক্রি করার কারণে দুর্ঘটনাও ঘটে।

সরবরাহে ঘাটতি নেই, সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রির অনুরোধ : বর্তমানে এলপিজির সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে প্রায় ১.৮৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ১.৫ লাখ টন। এরপরও যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে ভোক্তাদের কাছ থেকে বাড়তি দাম আদায় করছেন ব্যবসায়ীরা।

মঙ্গলবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে একটি চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করতে সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে অনুরোধ জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি)।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, ‘এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের এ অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এ মুহূর্তে জনদুর্ভোগ কমানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাই দেশের সব এলপিজি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রির জন্য অনুরোধ করা হলো।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত