শিক্ষাই বড় বিনিয়োগ

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

সরকারের মূল দর্শন হচ্ছে ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।’ এই দার্শনিক ও ডাইমেনশনাল বক্তব্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে। প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কার্যকর করা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে ১৫শ প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য এডু-আইডি প্রদান করা হবে। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ২৩৩৬টি কারিগরি, ৮২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াইফাই চালু করা হবে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে আগামী মাসের মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই), সাইবার সিকিউরিটি এবং পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি উপজেলায় একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণ হবে। ২ লাখ শিক্ষার্থীকে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে ৪ কোটি প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে।

প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক। কারণ অতীতে এ রকম অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিকল্পনা কোনো সরকার নেয়নি। তবে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার নারীর ক্ষমতায়নে তাদের শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও বিনা বেতনে এইচএসসি পর্যন্ত কায়েম করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত তখন ছিল দূরদর্শী। নারী ক্ষমতায়নে খালেদা জিয়ার চেয়েও তারেক রহমানের শিক্ষা পরিকল্পনা ‘বিপ্লবী’ বলতে হবে। বিশেষ করে, প্রান্তিক স্তরের শিশুশিক্ষা ও তাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ যদি সত্যিই কার্যকর হতে পারে, তাহলে ধারণা করা যায়, বঞ্চিত শিশু নাগরিকরা পেয়েছে যোগ্য পরিকল্পক। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে কর্মকর্তাদের ভেতরে সেই নৈতিক বল ও দেশপ্রেম থাকতে হবে। তখনই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে। আবার বিদ্যুৎ, ওয়াইফাই, স্কুল-কলেজ অবকাঠামো নির্মাণ করে প্রান্তিক শিশু-কিশোরদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ অত সহজ নয়। আবার তার সঙ্গে শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করা। সমকালীন বিশে^র সঙ্গে তাল মেলাতে হলে, তুলে আনতে হবে উন্নতমানের শিক্ষা উপাদান-উপকরণ। সেই সঙ্গে বাছাই করতে হবে  কোন যোগ্যতার শিশুকে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হবে, কাদের উচ্চশিক্ষায় পাঠানো হবে। কারা শিক্ষক হবেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং দক্ষতাও সঠিকভাবে ব্যবহারের বিকল্প নেই। শুধু শিক্ষা উপকরণ ও অবকাঠামো নয়, মানসিক ও নৈতিকভাবে উন্নতমানের প্রশিক্ষণদানও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সরকারের এই পরিকল্পনাকে সাধুবাদ জানাই। এত গভীরভাবে প্রান্তিক ও মধ্যপ্রান্তিক সমাজের শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য আর কেউ ভাবেননি। এই ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে ১৮০ দিনের মধ্যে যে দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে, তা বিস্তার লাভের সুযোগ ও সহযোগ দিতে হবে সমাজের পক্ষ থেকে। বিশেষ করে, দেশের শিক্ষিত মানুষদের এ ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের দায়িত্ব আছে, সমাজের বঞ্চিত-অবহেলিত-প্রান্তিকদের জন্য দায় পরিশোধের। সরকার একা নয়, তার পাশে থাকতে হবে শিক্ষিত ও সুযোগপ্রাপ্ত অংশকে। শিক্ষিত প্রজন্ম যাতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন না রাখে, তাদের বিপ্লবের অংশীজন করে তোলাও সরকারের অন্যতম কাজ ও লক্ষ্য হতে হবে। উন্নত ও নগরকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও প্রান্তিক স্তরের শিক্ষার মান যাতে সমান হতে পারে, সে খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষা গবেষকদের এ কাজে নিয়োগ দেওয়া হলে তারা সরকারকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। আমাদের শিক্ষা খাত বরাবর বঞ্চনার শিকার। শিক্ষাই যেখানে জাতির মেরুদন্ড, সেখানে জিডিপিতে বর্তমান বরাদ্দ কম মনে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত