তবুও শান্তি চাই

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১ এএম

দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা শেষে কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়া শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ বৈঠক। গত ৫০ বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। গতকাল সকালে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘোষণা দেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। কারণ শুরুতেই উভয়পক্ষ অবিশ্বাসের মানসিকতা নিয়ে শান্তি আলোচনায় বসেছিল ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া আলোচনায়, উভয়পক্ষ বিনিময় করেছে লিখিত দাবিনামা। বৈঠকের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং অন্যদিকে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফে। প্রথম ধাপ আলোচনায় উভয়পক্ষ কোনো রকম ছাড় দিতে সম্মত নয়। পাকিস্তান চেয়েছিল, আলোচনা জিইয়ে রেখে উভয়পক্ষকে রবিবার পর্যন্ত আলোচনায় টেনে নেওয়া। কারণ যতবার আলোচনায় আসবে বিষয়টি, ততবারই খুলতে থাকবে জটিল ও কুটিল তন্তু। তখন স্পষ্ট দেখা যাবে কে, কোন পক্ষ, কী রকম অবস্থানে আছে। আমেরিকা মনে করে, সে ইরানের সামরিক শক্তি ধসিয়ে দিয়েছে। তারা চায়, ইরানের হাতে থাকা ৪৬০ কেজি ইউরেনিয়াম যেন দখলে আসে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওমান ও পারসিয়ান সাগরে পোঁতা মাইনগুলোর অপসারণ। আর ইরান চায়, তাদের জব্দ করা সম্পদ ও তহবিল ফেরত, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির অপসারণ, অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া এবং যুদ্ধের জন্য যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা চালিয়েছিলেন আলোচনার সুতো যেন ছিঁড়ে না যায়। তবে মুশকিল হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে। আলোচনার প্রাক-মুহূর্তে তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে গত ১০ এপ্রিল শুক্রবার বলেছিলেন, আপনারা এমন সব মানুষের বিরুদ্ধে লড়ছেন, যাদের সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই যে, তারা আদৌ সত্য কথা বলে কিনা। তারা আমাদের বলেছে, সব পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে দিচ্ছে। আবার তারাই গণমাধ্যমের সামনে বলছে, আমরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে চাই। ২৪ ঘণ্টা দেখবেন তিনি। তারা যুদ্ধজাহাজ রিসেট করছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ও কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি অবিশ্বাস নিয়েই তারা আলোচনায় বসেছিলেন। মূল লক্ষ্য যে যুদ্ধ-সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা, এই আলোচনার টেবিল সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই পাকিস্তান এখনো কাজ করে চলেছে। যুদ্ধ কখনো শান্তি স্থাপন করে না। তলস্তয় তার ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ এই কথাই বলেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের দর্শন হচ্ছে, যুদ্ধ শান্তি আনতে পারে।  আমরা জানি যুদ্ধ, ধ্বংস আর নির্মম হত্যাযজ্ঞের অন্য নাম। ক্ষমতা ও সম্পদের লোভ মূলত অন্যায় যুদ্ধের সূচনা করে। যুদ্ধবাজ ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ শুষে নিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি বিশ্বের সম্পদ লুটেরা। তিনি ইরানি তেল শুষে নেওয়ার মতলবেই তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়েছেন।

ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো থেকে সামরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ভেবেছিলেন, ইরান কুপোকাত হবে। কিন্তু তা করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র  এবং তার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক শিখন্ডি ইসরায়েল। তারা এখন হতাশ বলেই নর্তনকুর্দন করছে। ইরান কোনো অন্যায়কে মেনে নেবে না। সে মানবতার দুঃখ-কষ্টে নিজেদের সীমাবদ্ধতা অনুধারণ করেই, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে আলোচনায় বসেছিল। যুদ্ধের কারণে গোটা বিশ্বে নেমে এসেছে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্ভোগ-দুর্দশা আর দুর্বিপাক। আমাদের মতো অর্থনৈতিক প্রগতির মহাসড়কে থাকা দেশের জন্য তা এক মারাত্মক ক্ষতি। এ ক্ষতি বন্ধ হবে তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি সংঘাত বন্ধ হবে। মধ্যপ্রাচ্য অবমুক্ত হোক আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মারণাস্ত্রের হাত থেকে। পৃথিবীর মানুষ স্বস্তির জীবনযাপন চায়, এটা যেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনুধাবন করে। অন্যায় যুদ্ধের অবসান হোক। আমরা আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ও সম্মানজনক সহাবস্থান চাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত