দুই শত বছরের ঐতিহ্যে ছয়চিড়ি দিঘীরপাড়ে চড়ক পূজা 

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ছয়চিড়ি দিঘীর পাড়ে অনুষ্ঠিত হলো বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও বর্ণিল লোক উৎসব চড়কপূজা। এতে পিঠে বড়শি বিঁধিয়ে সন্ন্যাসীদের ঘোরানো হয়, যাকে বলা হয় বড়শি বরণ। কাঁটা বা আগুনের ওপর হাঁটা এবং জিহ্বায় শলাকা ফোটানোসহ নানা রোমাঞ্চকর ও ভীতিজাগানিয়া কসরতের মাধ্যমে শিবের সন্তুষ্টি কামনা করেন সন্ন্যাসীরা। প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো চড়কপূজা আর গ্রামীণ মেলাকে ঘিরে এ জনপদ তখন পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।

চৈত্রের শেষ বিকেলের রোদ যখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, তখনই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় ঐতিহ্যবাহী ছয়সিড়ি দিঘীর পাড়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে দিঘীর চারপাশ যেন জনসমুদ্রে রূপ নেয়। কেবল স্থানীয় মানুষ নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরাও ছুটে আসেন এই বিরল আয়োজন প্রত্যক্ষ করতে। 

চড়কপূজা উৎসবের প্রাণ ছিল চিরাচরিত তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান। চারপাশে ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর ভক্তদের উচ্চারণে এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল চড়ক গাছে সন্ন্যাসীদের ঘোরানো। পিঠে বড়শি গেঁথে চড়ক গাছে ঝুলে থাকা সেই দৃশ্য দর্শকদের শিহরিত করে। একই সঙ্গে জ্বলন্ত আগুনের ওপর কালীনাচ এবং ধারালো দায়ের ওপর শিব শয্যা, এসব রোমাঞ্চকর আচার যেন লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার এক নাটকীয় প্রকাশ।

উৎসব আয়োজকরা জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ব্রত পালন শেষে ৪০ থেকে ৫০ জন সন্ন্যাসী এই দিনে তাদের কৃচ্ছ্রসাধনের সমাপ্তি ঘটান। দিঘীর উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে স্থাপিত চারটি চড়ক গাছকে কেন্দ্র করে চলে পূজা ও আচার। ভক্তরা ফুল, দুধ ও চিনি নিবেদন করে পূজা দেন, প্রার্থনা করেন মঙ্গল ও কল্যাণের। পূজার পাশাপাশি বসে বৃহৎ গ্রামীণ মেলা, যা উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নাগরদোলার ঘূর্ণন, শিশুদের উচ্ছ্বাস, আর মাটির তৈজসপত্র ও বাঁশ-বেতের পণ্যের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়, সব মিলিয়ে এক চিরচেনা গ্রামীণ বাংলার ছবি। খৈ, তিলুয়া-বাতাসার দোকানগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। 

চড়কপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অনিরুদ্ধ প্রসাদ রায় চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের এ আয়োজন এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষ একসঙ্গে মিলিত হয়ে এই উৎসবকে করে তোলেন সবার। প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো এ চড়কপূজা আর গ্রামীণ মেলা এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বুধবার দুপুরে এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের সমাপনী হয়।’

এদিকে একই সময়ে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগান মাঠেও চড়কপূজা ও মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানেও বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকসহ হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে তৈরি হয় এক আনন্দঘন, উৎসবমুখর পরিবেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত