যুদ্ধ থামানোর পাকিস্তানের উদ্যোগে ‘আশার আলো’

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২০ পিএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসন এবং এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে নতুন করে ‘আশার আলো’ দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এই আশাবাদ তৈরি করেছে। যেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।  

গত শনিবার যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল, যা ১৯৭৯ সালের পর মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ এবং ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। তবে আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই শেষ হয় এবং উভয় দেশের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। 

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আবারও সংলাপ শুরু হতে পারে। তার দাবি, পরিস্থিতি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কাছাকাছি। 

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা প্রায় শেষ। হ্যাঁ, আমি এটাকে শেষ হওয়ার খুব কাছাকাছি বলেই মনে করি।’

এরআগে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে। এই আলোচনার জন্য পাকিস্তানকেই উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনা করছেন তিনি।

পাকিস্তান কেন প্রথম পছন্দ—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ‘এর সম্ভাবনাই বেশি, জানেন কেন? কারণ ফিল্ড মার্শাল দারুণ কাজ করছেন। তিনি অসাধারণ, এবং তাই আমাদের সেখানে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমরা এমন কোনো দেশে কেন যাব যার এর সাথে কোনো সম্পর্কই নেই?’

পাকিস্তানের উদ্যোগ: 

মূলত, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরাসরি এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের সাথেই পাকিস্তানের সুসম্পর্ক থাকায় তারা এই মধ্যস্ততা সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার আগে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের উদ্দেশে চার দিনের সফরে গেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। 

বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সৌদি আরব ও কাতার সফর ‌দ্বিপাক্ষিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হবে। আর তুরস্কে অনুষ্ঠেয় আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে অংশ নেবেন তিনি। আন্তালিয়া ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। এই সফরে তার সঙ্গী হিসেবে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দারও রয়েছেন।

অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করতে ইতোমধ্যেই তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বার্তা পৌঁছে দিতে এবং দ্বিতীয় দফা আলোচনা সমন্বয় করতে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি প্রতিনিধিদল এই সফর করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এরআগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ইসলামাবাদে প্রথম দফায় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এখনো ‘বার্তা আদান-প্রদান’ অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকের ধারাবাহিকতায় বুধবার তেহরান পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ইরানি কর্মকর্তারা, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অবস্থান নিয়ে ‘বিস্তারিত আলোচনা’ হবে। 

এক্ষেত্রে ইরানকে তার প্রয়োজনে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে দিতে হবে। তবে পরমাণু সমৃদ্ধকরণের 'ধরন ও মাত্রা' নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাঘাই।

বিশ্লেষকরা কী বলছেন:

সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থায়ী শান্তির জন্য দুই পক্ষকেই কঠিন কিছু শর্তে ছাড় দিতে হবে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেভিড মিলারের বলেন, দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কৌশলগতভাবে ইরান এখন এগিয়ে আছে। 

তিনি সিএনএনকে বলেন, ইরান তাড়াহুড়ো করে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়; বরং তাদের হাতে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকে তারা আলোচনার টেবিলে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। 

ইসলামাবাদ ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহিদ হুসাইন ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার উদ্যোগকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। 

তার মতে, ইসলামাবাদের হতে যাওয়া দ্বিতীয় দফার সংলাপ আগামী সপ্তাহগুলোতে বড় কোনো উত্তেজনা প্রশমনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসির মতে, আলোচনার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। ট্রাম্পের সামরিক হুমকির মুখেও ইরান নতিস্বীকার করেনি, তাই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকৃত কূটনৈতিক আপসের মাধ্যমেই এগোতে হবে।

পাকিস্তানের সাবেক নৌ কমোডর ও কূটনীতিক মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ আল জাজিরাকে বলেন, প্রথম দফার আলোচনাতেই বড় কোনো ‘ব্রেকথ্রু’ বা সমাধান আশা করাটা অবাস্তব ছিল। তবে দুই পক্ষকে মুখোমুখি বসানোই একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য এবং দ্বিতীয় দফায় আলোচনার উদ্যোগ ‘কূটনীতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি’ বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত