আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি

পেকুয়া থেকে নিখোঁজ ১২, মুক্তিপণ দিয়ে ফিরছেন অনেকে

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

মালয়েশিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা থেকে অন্তত ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কয়েকজন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসার খবর পাওয়া গেছে।

নিখোঁজদের পরিবারে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের উত্তর মেহেরনামা তেলিয়াকাটা এলাকার নুরুল কাদেরের ছেলে ইসহাক মিয়া (৩৫), বদিউল আলমের ছেলে আজগর (২২), রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়াপাড়া এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে মো. বেলাল, আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান, আব্দুল মালেকের ছেলে রহিম, হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে সোহেল, নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, নতুন ঘোনা গোদারপাড়ার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের, শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক এবং আব্দুল হক কোম্পানির এক আত্মীয়। এছাড়া টৈটং ইউনিয়নের পেন্ডারপাড়া ও হিরাবুনিয়াপাড়া থেকে আরও দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন।

অন্যদিকে, বাঁশখালী উপজেলার পুইছড়ি ইউনিয়নের আরও অন্তত পাঁচজন নিখোঁজ থাকার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ১, ৩ ও ৬ এপ্রিল পৃথকভাবে এসব যুবক সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের তথ্যমতে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন।

পরিবারের অভিযোগ, একই এলাকার বাসিন্দা সাবেক করিয়ারদ্বিয়ার খায়রুল আমিন, তার প্রতিবেশী ওমর ফারুক এবং পেকুয়া সদরের নন্দীরপাড়ার দলিল আহমেদের ছেলে সিএনজি চালক বাদশা মিয়া তাদের নিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ির ইমাম শরীফের কাছে হস্তান্তর করেন। সেখান থেকে টেকনাফে নিয়ে গিয়ে তিন দিন অবস্থানের পর ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় দালাল চক্রও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

নিখোঁজ এহেসানের মা মোহসেনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ট্রলারে ওঠার পর। সে বলেছিল—‘মা, চিন্তা কইরো না, পৌঁছে ফোন দিমু।’ সেই ফোন আর আসেনি।

সোহেলের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলেটা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। ভালো জীবনের আশায় গেছে। এখন তার কোনো খোঁজ নেই— আমরা বাঁচব কেমনে?’

নিখোঁজ রহিমের স্ত্রী আজবাহার বেগম বলেন, ‘যাওয়ার সময় বলছিল তোমাদের ভালো রাখমু। এখন আমি কাকে ধরে বাঁচব?’

রাশেদুল ইসলামের নানী ছফুরা খাতুন বলেন, ‘নাতিটা আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। বিদেশে গিয়ে কিছু করবে, এই স্বপ্ন ছিল। আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া— ওরে ফিরায়া দাও।’

এদিকে একই ট্রলারে থাকা হামিদা বেগমের ছেলে মো. হাসান জীবিত ফিরে আসায় তাদের পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে নিখোঁজদের পরিবারের মধ্যে এখনো অনিশ্চয়তা ও শোক বিরাজ করছে।

রাজাখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নেজাম উদ্দিন নেজু জানান, তারা নিখোঁজদের পরিবারের পাশে রয়েছেন এবং তাদের সন্ধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফকেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তারা পেকুয়া ও বাঁশখালীর দরিদ্র ও বেকার যুবকদের টার্গেট করে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর প্রলোভন দেখায়।

স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, টৈটং ইউনিয়নের কেরুণছড়ি এলাকার আবুল হোসেন, তার মেয়ে হাসিনা বেগম ও জামাতা হাবিবুর রহমানসহ আরও কয়েকজন এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া গুধিকাটা এলাকার আবু তাহেরের ছেলে বত, বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার ফোরকান ও রুবেলও এই সিন্ডিকেটে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও জানা গেছে, রাজাখালী মাতবরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আহমদ ছবির মেয়ের জামাই এবং টেকনাফের নুরুল আলমসহ কয়েকজন দালাল সরাসরি লোক সংগ্রহ করে ট্রলারে তুলে দেয়। তাদের সহযোগী হিসেবে সাহাব উদ্দিন, ফিরোজ ও সাইফুলের নামও উঠে এসেছে।

জনপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এসব যুবককে সাগরপথে পাঠানো হয়। কিন্তু সেই স্বপ্ন অনেক সময়ই রূপ নেয় মৃত্যুফাঁদে।

সরেজমিনে জানা গেছে, নিখোঁজদের কেউ লবণ শ্রমিক, কেউ জেলে, আবার কেউ বেকার ছিলেন। অনেকেই পরিবারের অজান্তেই দালালদের প্রলোভনে পড়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় পা বাড়ান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচার চক্র সক্রিয় থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

পেকুয়া থানার ওসি খায়রুল আলম জানান, সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় নৌকা ডুবির ঘটনা সম্পর্কে তারা গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন। নিখোঁজদের সঙ্গে বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত