২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রেক্সিট গণভোটের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসে যুক্তরাজ্য। ঐতিহাসিক ওই গণভোটে যুক্তরাজ্যের ৫১.৯ শতাংশ জনগণ ইইউনিয়ন ত্যাগ করার পক্ষে রায় দেয়; বিপরীতে ৪৮.১ শতাংশ জনগণ ইউরোপের বৃহত্তম জোটে থাকার পক্ষে ভোট দেন। তবে এক দশক না পেরোতেই ব্রিটিশদের মোহভঙ্গ হয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির অর্ধেকের বেশি নাগরিক পুনরায় ইইউতে ফেরার পক্ষে মত দিয়েছেন। ‘বেস্ট ফর ব্রিটেন’ নামের একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু সিঙ্গেল মার্কেটে যোগ দেওয়ার চেয়ে সরাসরি ইইউতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির পক্ষে সমর্থন বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টির ৮০ শতাংশের বেশি সমর্থক ইইউতে ফেরার পক্ষে। সব মিলিয়ে ৫৩ শতাংশ ভোটার পূর্ণভাবে ইইউতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের ইইউ নীতিকে সমর্থন করেছেন ৬১ শতাংশ ভোটার, তবে এর মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ ‘জোরালো’ সমর্থন জানিয়েছেন। কনজারভেটিভ ও রিফর্ম পার্টির ভোটারদের মধ্যে যথাক্রমে ৩৯ ও ১৮ শতাংশ এই নীতিকে সমর্থন করেছেন। ফলে এক সময় যে ব্রেক্সিটকে সার্বভৌমত্ব ও সমৃদ্ধির চূড়ান্ত চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছিল, ২০২৬ সালের বাস্তবতায় তা এখন এক বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
‘বেস্ট ফর ব্রিটেন’-এর নীতি ও গবেষণা পরিচালক টম ব্রুফাত্তো বলেন, মধ্যবর্তী সমাধানগুলোয় ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণায় ছয়টি সম্ভাব্য নীতি বিশ্লেষণ করা হয়যার মধ্যে বর্তমান নীতি বজায় রাখা, বরিস জনসনের চুক্তি অনুসরণ, আরও বিচ্ছিন্ন হওয়া, কাস্টমস ইউনিয়ন ও সিঙ্গেল মার্কেটে যোগ দেওয়া এবং পূর্ণভাবে ইইউতে ফিরে যাওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে কাস্টমস ইউনিয়ন ও সিঙ্গেল মার্কেটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ আলোচনায় জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে লেবার পার্টি সিঙ্গেল মার্কেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি সহজ করতে স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) চুক্তির উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও ‘নিয়ম অনুসরণ’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে এ ধরনের আলোচনায় যুক্তরাজ্য ৭৬টি নিয়মে ভিন্নতা তৈরি করেছে। ওয়েস্টমিনস্টারে এক অনুষ্ঠানে জরিপ বিশ্লেষক জন কার্টিস লেবারের ‘নীরব কৌশল’-এর সমালোচনা করে বলেন, ব্রেক্সিট ইস্যুতে অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, প্রো-ব্রেক্সিট ভোটার হারানোর চেয়ে উদারপন্থি ভোটার হারানো বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি জানান, লেবার যেখানে প্রতি ১০ জনে একজন ভোটার হারিয়েছে রিফর্ম পার্টির কাছে, সেখানে লিবারেল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টির কাছে হারিয়েছে প্রতি চারজনের একজন। সাবেক লেবার এমপি রিচার্ড করবেটের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিটেন এখন আর আগের মতো ব্রেক্সিটের সুফল নিয়ে বড়াই করতে পারছে না; বরং জনমত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা দেশটিকে পুনরায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে ঠেলছে। আরেক সাবেক লেবার নেতা নিল কিনক বলেন, ব্রেক্সিট যুক্তরাজ্যের বড় ক্ষতি করেছে এবং ভবিষ্যতে লেবার আবার ইইউতে যোগদানের পক্ষে প্রচার চালাতে পারে।
‘ইউকে ইন এ চেঞ্জিং ইউরোপ’-এর পরিচালক আনন্দ মেনন বলেন, লেবারের বর্তমান নীতিতে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব রয়েছে। তার মতে, ব্রেক্সিটের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেএ কথা স্বীকার করলেও সীমিত সংস্কার দিয়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ধাপে ধাপে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক মানদণ্ডে সামঞ্জস্য আনতে গেলে যুক্তরাজ্য ক্রমেই ‘নিয়ম গ্রহণকারী’ দেশে পরিণত হবে, যা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াবে। এছাড়া ইইউর নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন হবে, যাতে অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি না ঘটে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান প্রশাসনিক দিক থেকে জটিল ও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে বেশকিছু বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ব্রেক্সিটের দুই বছর পর যেখানে বলা হয়েছিল ব্রিটিশ অর্থনীতি ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে তা এখন প্রায় ৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বার্ষিক ৮০ থেকে ৯০ বিলিয়ন পাউন্ডের এই রাজস্ব ঘাটতি ব্রিটেনের সরকারি ব্যয় ও জনসেবা খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পটপরিবর্তন ব্রিটেনের একাকীত্বকে প্রকট করে তুলেছে। একদিকে পুতিনের আগ্রাসন আর অন্যদিকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিএই দুই জাঁতাকলে পড়ে ব্রিটেনের তথাকথিত ‘বিশেষ সম্পর্কের’ ধারণাটি এখন মৃতপ্রায়।
