সময়ের বিশাল সমুদ্রে মানুষ যখন প্রথম দিকচিহ্ন আঁকতে শুরু করল, তখন থেকেই ক্যালেন্ডারের জয়যাত্রা শুরু। ক্যালেন্ডার নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
পৃথিবীর ইতিহাসে ক্যালেন্ডারের প্রয়োজনীয়তা প্রথমে দেখা দিয়েছিল বেঁচে থাকার তাগিদে। কৃষিনির্ভর সমাজগুলোতে সঠিক সময়ে ফসল না লাগালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে হতো। নীল নদের প্লাবন থেকে শুরু করে গাঙ্গেয় বদ্বীপের বর্ষার আগমন সবই ছিল প্রকৃতির একটি নির্দিষ্ট চক্রের অংশ। সেই চক্রকে বোঝার জন্য মানুষ চাঁদ এবং সূর্যকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করল। মূলত তিন ধরনের ক্যালেন্ডার পদ্ধতি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। সৌর ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যা আজ সারা বিশ্বে প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয়। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ছিল এর আদি রূপ, যা প্রাচীন রোমে প্রচলিত ছিল। সৌর ক্যালেন্ডারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, যেখানে একটি বছর সাধারণত তিনশ পঁয়ষট্টি দিনে সীমাবদ্ধ থাকে।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার
বর্তমানে আমরা বিশ্বজুড়ে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে যে ক্যালেন্ডারটি ব্যবহার করি, তা হলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। পনেরোশ বিরাশি সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ এটি প্রবর্তন করেন। মূলত জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্রুটি সংশোধন করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর যে সময় লাগে, তার সঙ্গে ক্যালেন্ডারের দিনের পার্থক্য কমিয়ে আনাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একটি বছর তিনশ পঁয়ষট্টি দিন পাঁচ ঘণ্টা আটচল্লিশ মিনিট এবং ছেচল্লিশ সেকেন্ডের সমান। এই বাড়তি সময়টুকুর ভারসাম্য রক্ষা করতেই প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন যোগ করে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের নিয়ম চালু করা হয়। এটি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নিখুঁত হিসেবে স্বীকৃত সৌর ক্যালেন্ডার। সময়ের এই নিখুঁত হিসাব আমাদের আধুনিক বিশ্বকে একটি অভিন্ন ছকে বেঁধে রেখেছে।
সৌর-চন্দ্র পদ্ধতি
অন্যদিকে চন্দ্র ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে চাঁদের কলার ওপর নির্ভর করে। ইসলামিক ক্যালেন্ডার বা হিজরি সাল এই পদ্ধতির সার্থক উদাহরণ। এখানে প্রতিটি মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে। একটি চন্দ্র মাস সাড়ে ঊনত্রিশ দিনের মতো হওয়ায় চন্দ্র বছর সৌর বছরের তুলনায় প্রায় দশ থেকে বারো দিন ছোট হয়। এ কারণে প্রতি বছর উৎসবের তারিখগুলো আগের বছরের তুলনায় এগিয়ে আসে। আবার অনেক সংস্কৃতিতে সূর্য এবং চাঁদ উভয়ের সমন্বয়ে সৌর-চন্দ্র ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়েছে। চীনা ক্যালেন্ডার এবং হিব্রু ক্যালেন্ডার এই ধারার অন্তর্ভুক্ত। এতে চাঁদের মাস অনুসরণ করা হলেও নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করে ঋতুর সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়, যাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় লিপ ইয়ারের একটি উন্নত সংস্করণ বলা যেতে পারে। হিব্রু ক্যালেন্ডারও একটি লুনিসোলার পদ্ধতি, যা ইহুদি ধর্মের উৎসব এবং পবিত্র দিনগুলো নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। এই ক্যালেন্ডারে বছরের দৈর্ঘ্য এবং মাসের সংখ্যায় পরিবর্তন আনা হয়, যাতে ধর্মীয় উৎসবগুলো সবসময় নির্দিষ্ট ঋতুতে পড়ে।
বাংলা ক্যালেন্ডার ও কৃষিজীবিতা
বাঙালির প্রাণের ক্যালেন্ডার হলো বঙ্গাব্দ। এর উৎপত্তির ইতিহাস বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হতো, কারণ ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে হিজরি ক্যালেন্ডার মিলত না। তাই কৃষকদের সুবিধার্থে সৌর বছরের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির নির্দেশ দেন তিনি। জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি হিজরি সৌর এবং প্রাচীন হিন্দু ক্যালেন্ডারের সমন্বয়ে ফসলি সন বা বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। বাংলা ক্যালেন্ডারের ছয়টি ঋতু এবং বারোটি মাস আমাদের কৃষি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৈশাখ থেকে শুরু হওয়া এই ক্যালেন্ডার আজও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জাতীয় উৎসব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে আমরা যখন নতুন বছরকে বরণ করি, তখন সেটি কেবল একটি তারিখ পরিবর্তন নয়, বরং তা আমাদের মাটির টান আর ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন।
চীনা ক্যালেন্ডার
চীনা ক্যালেন্ডার একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং জটিল পদ্ধতি, যা সূর্য এবং চাঁদ উভয়ের গতির ওপর নির্ভর করে তৈরি। একে বলা হয় লুনিসোলার ক্যালেন্ডার। এতে নতুন বছর শুরু হয় সাধারণত একুশে জানুয়ারি থেকে বিশে ফেব্রুয়ারির মধ্যে কোনো এক সময়ে। চীনা ক্যালেন্ডারের একটি মজার বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি বছর একেকটি প্রাণীর নামে চিহ্নিত করা হয়, যেমন ড্রাগন, বাঘ, ঘোড়া ইত্যাদি। যদিও আধুনিক চীনে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হয়, তবে উৎসব পালন এবং শুভ দিন নির্ধারণে তারা এখনো এই ঐতিহ্যবাহী ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। সৌর এবং চন্দ্র বছরের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে তারা নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি বাড়তি মাস যোগ করে, যা এই ক্যালেন্ডারকে অনন্য করে তুলেছে। তাদের বারো বছরের চক্র এবং প্রাণীদের প্রতীকী ব্যবহার এই ক্যালেন্ডারকে বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন পঞ্জিকাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
মায়া ক্যালেন্ডার
মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়া সভ্যতার মানুষ সময় গণনায় অবিশ্বাস্য রকমের দক্ষ ছিল। তাদের প্রধানত তিনটি ক্যালেন্ডার ছিল জোলকিন (ধর্মীয় কাজের জন্য দুইশ ষাট দিনের ক্যালেন্ডার), হাব (সৌর ক্যালেন্ডার তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের) এবং লং কাউন্ট (দীর্ঘমেয়াদি সময় গণনার জন্য)। মায়া ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিশাল সময়ের চক্রকে বাকতুন বলা হয়। দুই হাজার বারো সালে তাদের একটি বড় চক্র শেষ হওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ধ্বংসের যে মিথ তৈরি হয়েছিল, তা আসলে ছিল তাদের ক্যালেন্ডারের একটি বড় ইউনিটের সমাপ্তি মাত্র। তাদের গাণিতিক নির্ভুলতা আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয়, কারণ তারা টেলিস্কোপ ছাড়াই নক্ষত্রপুঞ্জের গতিবিধি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মেপে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল। তাদের এই অদ্ভুত জ্যামিতিক হিসাব প্রমাণ করে যে, প্রাচীন মানুষ মহাবিশ্বের ছন্দ বুঝতে কতটা আগ্রহী ছিল।
ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডার
ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডার আমাদের সাধারণ ধারণার চেয়ে একেবারেই আলাদা। যখন সারা বিশ্ব একই বছর উদযাপন করছে, তখন ইথিওপিয়া সাত থেকে আট বছর পিছিয়ে থাকে। এর কারণ হলো তারা যিশুখ্রিস্টের জন্মের তারিখ গণনায় ভিন্ন এক প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করে। তাদের ক্যালেন্ডারে বছরে তেরোটি মাস থাকে। প্রথম বারোটি মাস ত্রিশ দিনের এবং তেরোতম মাসটি মাত্র পাঁচ বা ছয় দিনের হয়। পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি বিষয় যে, ইথিওপিয়া ভ্রমণে গেলে তারা আক্ষরিক অর্থেই অন্য এক সময়ে পা রাখেন। এই ক্যালেন্ডার তাদের দীর্ঘদিনের অর্থোডক্স খ্রিস্টান ঐতিহ্য এবং স্বকীয়তাকে ধরে রেখেছে। পারস্য বা ইরানীয় ক্যালেন্ডারকেও ধরা হয় পৃথিবীর অন্যতম নিখুঁত সৌর ক্যালেন্ডার হিসেবে, যা মহাজাগতিক বিষুবরেখার ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়।
ক্যালেন্ডার সংস্কার ও বিজ্ঞান
ক্যালেন্ডার সংস্কারের ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। বর্তমানে আমরা যে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, সেটি প্রবর্তনের আগে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল। কিন্তু সেখানে সময়ের গণনায় সামান্য ভুল থাকায় কয়েকশ বছরে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরি এই ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেন। সেই সময় ক্যালেন্ডার থেকে দশটি দিন একেবারে মুছে ফেলা হয়েছিল, যাতে হিসাবের মিল আনা যায়। সেই সঙ্গে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের ধারণাটি আরও নিখুঁত করা হয়। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রায় ক্যালেন্ডার কেবল একটি কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি মানুষের যান্ত্রিক উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিটি প্রধান ধর্মেই আলাদা ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা অনুসরণের রীতি আছে। হিন্দু ধর্মে তিথি অনুযায়ী পূজা-পার্বণ নির্ধারিত হয়, খ্রিস্টধর্মে বড়দিন কিংবা ইস্টারের তারিখ গণনায় নির্দিষ্ট রীতি মানা হয়।
বিস্ময়কর কিছু তথ্য
সময়ের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত সব গল্প আমাদের ভাবিয়ে তোলে যে, আজ আমরা যা অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি, তার পেছনে রয়েছে শত শত বছরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ক্ষমতার লড়াই। ক্যালেন্ডারের পাতায় ফেব্রুয়ারি মাস কেন সবচেয়ে ছোট, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রাচীন রোমে। রোমের প্রথম দিককার ক্যালেন্ডার ছিল মাত্র দশ মাসের। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেখানে শীতের সময়টুকুকে কোনো মাসের মধ্যেই ধরা হতো না, কারণ সেই সময় কৃষি বা যুদ্ধের কোনো কাজ চলত না। পরবর্তীতে পম্পিলিয়াস নামের এক রাজা জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিকে বছরের শেষে যুক্ত করেন। সেই সময়ে রোমানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস ছিল যে, জোড় সংখ্যা অশুভ, তাই তারা মাসের দিনগুলো বেজোড় রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু বছরের মোট দিনের হিসাব মেলাতে গিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসটি শেষ পর্যন্ত আটাশ দিনের অর্থাৎ জোড় সংখ্যার হয়ে যায়। এই কারণেই দীর্ঘকাল ফেব্রুয়ারিকে একটি অশুভ বা শুদ্ধিকরণের মাস হিসেবে দেখা হতো।
পরবর্তী সময় জুলিয়াস সিজার যখন ক্যালেন্ডার সংস্কার করেন, তখন তিনি নিজের নামে জুলাই মাসের নামকরণ করেন এবং সেটিকে একত্রিশ দিনের করেন। এরপর যখন অগাস্টাস সিজার সম্রাট হলেন, তখন তার সম্মানে আগস্ট মাসের নামকরণ করা হয়। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, অগাস্টাস সিজার চাননি তার নামের মাসটি জুলিয়াস সিজারের মাসের চেয়ে ছোট হোক। তাই আগস্ট মাসকে একত্রিশ দিনের করার জন্য ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আরও একটি দিন কেটে নেওয়া হয়, যার ফলে ফেব্রুয়ারি আটাশ দিনে এসে ঠেকে। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকরা একে ক্ষমতার দাপটের চেয়ে গাণিতিক সংস্কার হিসেবেই বেশি দেখেন, তবুও ইতিহাসের এই গল্পগুলো ক্যালেন্ডারকে কেবল একটি যান্ত্রিক ছক থেকে মানবিক সংঘাতের দলিলে রূপান্তর করেছে।
আবার নতুন বছরের শুরুর সময় নিয়েও পৃথিবীতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। আজ আমরা পয়লা জানুয়ারিকে নতুন বছর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালন করলেও, ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপের অনেক দেশে ২৫ মার্চ অর্থাৎ বসন্তের শুরুতে বছর শুরু হতো। এমনকি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের সময় দেশভেদে তারিখ পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবন থেকে হুট করে দশ-বারো দিন হারিয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো দেশে মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখল ক্যালেন্ডারে তারিখ দশ দিন এগিয়ে গেছে, যা সেই সময় দাঙ্গা এবং প্রতিবাদেরও জন্ম দিয়েছিল।
