নির্বিচারে শিকারে বিপন্ন পাঙাশ

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

পটুয়াখালীর তেঁতুলিয়া, আগুনমুখা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর মোহনার সংযোগস্থলের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দেশীয় পাঙাশের পোনার প্রধান বিচরণক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছেন মৎস্য গবেষকরা। পাঙাশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য এসব এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইতিমধ্যে সেগুলোকে অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব এলাকাতেই চলছে পাঙাশের পোনার নির্বিচার আহরণ, যা এই প্রজাতির মাছটির অস্তিত্ব¡কে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মৎস্য আইন অনুযায়ী, ১২ ইঞ্চি (৩০ সেন্টিমিটার) এর কম আকারের পাঙাশ ধরা নিষিদ্ধ হলেও তা মানছেন না অসাধু জেলেরা। তারা তেঁতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ ও আগুনমুখা নদীর মোহনায় বাঁশের তৈরি ‘চাঁই’ কিংবা ছোট ফাঁসের জাল ‘গফ্ফা’ ও ‘ঝাই’ দিয়ে অবাধে পোনা মাছ আহরণ করছে। প্রতিবছর প্রজনন মৌসুম এলেই এই প্রবণতা বাড়ে অসাধু জেলেদের। ফলে প্রাকৃতিকভাবে পাঙাশের সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় মৎস্য বিভাগ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসডিএর অর্থায়নে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিস বাংলাদেশ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২০ সালে গলাচিপা উপজেলার চরকাজল, চরবিশ্বাস ও বন্যাতলী এবং রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া, চরকাসেম, আন্ডারচর ও সোনারচর এই সাতটি এলাকায় পাঙাশ ও সংশ্লিষ্ট প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটির কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়ায় তদারকিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সহজে অধিক পরিমাণ পোনা ধরা যায় বলেই ‘চাঁই’ ব্যবহারে ঝুঁকছেন তারা। বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত খাবার দিয়ে পাঙাশের পোনা আকৃষ্ট করে ‘চাঁই’ নদীতে ডুবিয়ে রাখা হয়, যা তুললেই পোনায় ভরে যায়।

অন্যদিকে, শহরের নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে প্রকাশ্যেই পাঙাশের পোনা বিক্রি হতে দেখা গেছে। প্রতিকেজি পোনা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সচেতন মানুষ এগুলো না কিনলেও দাম কিছুটা কম বলে গরিব মানুষ এগুলো দেদার কিনে নিচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, ‘যেকোনো মাছের পোনা আহরণ করলে সেই মাছ দ্রুত কমে যায়। এভাবে চললে পাঙাশ মাছেরও এক সময় সংকট দেখা দেবে। তাই যেকোনো উপায়ে পোনা ধরা বন্ধ করতে হবে। পোনা ধরা বন্ধ করা গেলে এই অঞ্চল ইলিশের পাশাপাশি পাঙাশেরও বড় ভা-ারে পরিণত হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে দেশীয় পাঙাশের প্রাকৃতিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  হবে। তাই অভয়াশ্রমগুলোতে কঠোর নজরদারি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে এর টেকসই সমাধান।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাজেদুল হক বলেন, পাঙাশ দ্রুত বর্ধনশীল ক্যাটফিশ প্রজাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাছ, যা সর্বোচ্চ ৬০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। দেশে ইলিশের পর উৎপাদনের দিক থেকে ক্যাটফিশ তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তিনি ইলিশের মতো পাঙাশের ক্ষেত্রেও অভয়াশ্রম ঘোষণা, প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর নজরদারির ওপর জোর দেন। 

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল নবী জানান, সম্প্রতি সাত দিনের অভিযানে চারটি চাঁই, তিনটি অবৈধ জাল এবং ১২ কেজি মৃত পাঙাশের পোনা জব্দ করা হয়েছে। তবে লোকবল সংকটের কারণে সব এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘নভেম্বর থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের নিচের পাঙাশ ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও অসাধু জেলেরা নানা কৌশলে এই আইন লঙ্ঘন করছে।’ তিনি জানান, পাঙাশ রক্ষায় অবৈধ জাল ও চাঁই উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত