মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৩ এএম

কোনোটির হাত নেই, কোনোটির পা নেই। আবার কোনোটির মাথা ভেঙে পড়ে আছে। এমন ক্ষত ও আঘাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির শত শত ভাস্কর্য শিল্পগুলো। এখনো সংস্কার বা ভেঙে ফেলা ভাস্কর্যগুলো সরিয়ে না নেওয়ায় মুজিবনগরের এমন ভগ্ন রূপ দেখে থমকে যাচ্ছেন স্বাধীনতার স্বাদ নিতে সেখানে যাওয়া শত শত পর্যটক দর্শনার্থীরা।

ভগ্ন মুজিবনগর দেখতে গিয়ে এক প্রশ্নে দেশের মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, আমরা কোনো দল বা মতের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। আমাদের একমাত্র বিশ্বাস একাত্তর এবং মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধই সর্বশ্রেষ্ট অর্জন। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা ও মানচিত্র পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত জনযুদ্ধ। কোনো একক দল বা মতের নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও এর স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়। এটি জাতির সম্পদ। সরকার দ্রুত মুজিবনগরের সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করার কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে মুজিবনগরকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করবে আশা করি।

সরেজমিন দেখা গেল, ঐতিহাসিক মুজিবনগরে নির্মিত সব স্থাপত্যশৈলী ভাস্কর্যগুলো দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কোনোটিই অক্ষত নয়। স্থানীয়রা জানান, ২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত হামলাকারীরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির মানচিত্রের ঐতিহাসিক ম্যুরালগুলো নিশ্চিহ্ন করতে দিনে এবং রাতে ঝটিকা হামলা চালিয়েছিল। তখন ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনি। অথচ ঐতিহাসিক মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের নিরাপত্তার দায়িত্ব রয়েছে অর্ধশত আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য। চর্তুদিকে রয়েছে সিসি ক্যামেরা। এই প্রশ্নে একজন আনসার সদস্য বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী তারা ভীতসন্ত্রস্ত থাকায় দায়িত্ব ছেড়ে নিরাপদ অবস্থানে ছিল। ওইদিন বিকেলে সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে একটি গোষ্ঠীর শত শত মানুষ লোহার রড, লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হয় মুজিবনগর কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের ওপর। সেই হামলায় সেখানে নির্মিত সাড়ে ৫শ ভাস্কর্যের মধ্যে ভেঙে নষ্ট করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩শ ভাস্কর্য। মূলত নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে ধরে রাখতে সরকারিভাবে মুজিবনগরকে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত আর্কাইভরূপে দঁড় করানো হয়েছিল। বাংলাদেশের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সবচেয়ে বেশি ভাস্কর্যের অন্যতম দর্শনীয় স্থান মুজিবনগর। তাই মুক্তিযুদ্ধকে জানতে পরবর্তী প্রজন্ম ভিড় করে মুজিবনগরে।

মুজিবনগরে এমন হামলা প্রসঙ্গে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সামসুল আলম সোনা বলেন, ইতিহাসের ঐতিহাসিক মুজিবনগরকে যারা কুঠারাঘাত করেছে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধেও বিরোধিতা করেছিল। ২৪ আগস্ট পরবর্তী ওই গোষ্ঠী তাদের পুরনো খায়েশ মেটাতে মুজিবনগরকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ, মুজিবনগর মুছে ফেলা যায় না। মুজিবনগরের করুণ এই পরিণতি দেখে সিপিবির কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতরে ছদ্মবেশী একটি গোষ্ঠী মুজিবনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিফলকে হামলা চালিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত স্মৃতিচিহ্নগুলো এখনো পুনঃস্থাপন করার উদ্যোগসহ দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি।

গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এরশাদ সরকারের আমলে প্রথম নকশা অনুযায়ী মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময় বিএনপি-আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে নকশা কাটছাঁট করে ৬০ একর জায়গার ওপর মুজিবনগরে সাড়ে ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালে কাজ শেষ হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই ২০২২ সালে সরকার মুজিবনগরের সব ভাস্কর্য ভেঙে আরও বড় এবং আন্তর্জাতিকমানের করতে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। আরও ৩০ একর জায়গা অধিগ্রহণের প্রস্তুতি শেষ করে ২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেই নতুন কাজ শুরুর ঘোষণা দেয় তৎকালীন সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত