তকদির আল্লাহর রহস্য

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

গত শুক্রবার মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দাওসারি তাকওয়া অবলম্বন, তকদিরে বিশ্বাস এবং আল্লাহর ওপর ভরসা মুমিন জীবনের মূল ভিত্তি উল্লেখ করে বলেন, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে এবং এতে বিশ্বাস রাখা অপরিহার্য। মুমিন জানে, যা পেয়েছে তা তার জন্য নির্ধারিত ছিল। আর যা পায়নি, তা তার জন্য ছিল না। তকদির হলো সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর একটি রহস্য। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, হিংসা ত্যাগ করা এবং তার ওপর নির্ভর করাই সফলতার পথ।

শায়খ বলেন, হে লোকসকল! আমি আপনাদের এবং নিজেকে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। নিশ্চয়ই মুত্তাকিরা সফলকাম হয়েছে। আপনারা প্রতিটি কাজে রবের ওপর ভরসা করুন। জেনে রাখুন, প্রতিটি বিষয় তার ফয়সালা অনুযায়ী হয়, যিনি কোনো কিছুকে ‘হও’ বললে তা হয়ে যায়।

হে মুসলিম সমাজ! তকদির বা ভাগ্যের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ইমানের অন্যতম স্তম্ভ। এর মাধ্যমেই বান্দা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায়। জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যদি তোমার কাছে ওহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তুমি তা আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তবুও যতক্ষণ না তুমি তকদিরে বিশ্বাস করবে, আল্লাহ তা কবুল করবেন না। জেনে রেখো, তোমার কাছে যা পৌঁছেছে, তা তোমাকে ভুল করে এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না। আর যা তোমার কাছে পৌঁছেনি, তা তোমার কাছে আসার ছিল না। যদি তুমি এই বিশ্বাস ছাড়া মৃত্যুবরণ করো, তবে তুমি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (ইবনে মাজাহ ৭৭)

হে লোকসকল! তকদির হলো সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর একটি রহস্য। মহান আল্লাহর নির্ধারিত প্রতিটি বিষয় তার হেকমত অনুযায়ী সংঘটিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি সবকিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।’ (সুরা কামার ৪৯) তিনি আরও বলেন, ‘তিনি প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং তা সুনিপুণভাবে নির্ধারণ করেছেন।’ (সুরা ফুরক্বান ২) তিনিই অস্তিত্ব দান করেন ও ধ্বংস করেন, দরিদ্র করেন ও ধনী করেন, মৃত্যু দেন ও জীবন দান করেন, পথভ্রষ্ট করেন ও পথ দেখান।

আল্লাহ আমাদের কাছে যা প্রকাশ করেছেন, আমরা তাতে ইমান আনি এবং যা তিনি তার ইলমে গোপন রেখেছেন, যার হেকমত ও উদ্দেশ্য আমাদের কাছে অস্পষ্ট, তা আমরা তার ওপর সমর্পণ করি এবং সন্তুষ্ট থাকি। আমরা আল্লাহর হেকমতের পূর্ণতা, তার নির্ধারণের মহত্ত্ব এবং তার রাজত্বে তার ইচ্ছার কার্যকারিতার ওপর বিশ্বাস রাখি। তিনি তো সেই প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ, যাকে তার কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা যায় না, বরং সৃষ্টিজগৎকেই প্রশ্ন করা হবে। তিনি সব অবস্থায় প্রশংসিত, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই।

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর ওপর প্রকৃত ইমান আনে এবং জানে যে সবকিছুই দয়াময় ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর ফয়সালা ও তকদির অনুযায়ী হয়, আর তার ইমানকে কথা ও কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে, আল্লাহ তার অন্তরকে সন্তুষ্টির মাধ্যমে সুদৃঢ় করেন এবং আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের পথ দেখান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ইমান আনে, তিনি তার অন্তরকে পথপ্রদর্শন করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা তাগাবুন ১১)

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে তার ওপর নির্ভরশীল হয়, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। যে ব্যক্তি তার আশ্রয় নেয়, তিনি তাকে রক্ষা করেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কষ্ট সহ্য করে, আল্লাহ তা সহজ করে দেন। আর যে ব্যক্তি সত্যের সন্ধানে থাকে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হন এবং কল্যাণের পথকে তার জন্য শোভিত করেন। যার মৃত্যু নির্ধারিত, সে সৃষ্টিকে কেন ভয় পাবে? যার রিজিক বণ্টিত, সে কেন দারিদ্র্যের ভয় করবে? যে জানে আল্লাহই মুসিবত নির্ধারণ করেছেন, সে কেন তাতে অসন্তুষ্ট হবে? আর যে জানে আল্লাহই তা পরিচালনা করছেন, সে কেন এর সওয়াব ও প্রতিদানের আশা করবে না? বান্দা যখন এসব বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে, তখন আল্লাহ তার বিপদ-আপদ সহ্য করা সহজ করে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে আল্লাহ তাদের দুনিয়ার জীবনে ও আখেরাতে শাশ্বত বাণীর মাধ্যমে সুদৃঢ় রাখেন।’ (সুরা ইবরাহিম ২৭) এর ফলে সে মহান সওয়াব লাভ করে, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, ‘ধৈর্যশীলদেরই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই। (সুরা জুমার ১০)

হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখুন, তকদিরে বিশ্বাসের চারটি স্তর রয়েছে। প্রথমটি হলো ইলম বা জ্ঞান, অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞান যে প্রতিটি বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে তা বিশ্বাস করা। যা হয়েছে, যা হচ্ছে, যা হবে এবং যা হয়নি কিন্তু হলে কেমন হতো, সে সম্পর্কে তিনি অবগত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি যেকোনো অবস্থায় থাকো এবং তুমি কোরআন থেকে যাই তেলাওয়াত করো, আর তোমরা যে আমলই করো না কেন, তোমরা যখন তাতে লিপ্ত হও তখন আমি তোমাদের প্রত্যক্ষদর্শী থাকি। তোমার রবের অগোচরে জমিন বা আসমানের অণু পরিমাণ কোনো কিছু নেই এবং এর চেয়ে ছোট বা বড় এমন কিছু নেই যা কিতাবে (লওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ নেই।’ (সুরা ইউনুস ৬১)

দ্বিতীয় স্তর হলো কিতাবাত বা লিখন পদ্ধতি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ লওহে মাহফুজে সমস্ত সৃষ্টির তকদির লিখে রেখেছেন। তিনি আয়ু, মৃত্যু, দুর্ভাগ্য, সৌভাগ্য, রিজিক, আমল সবকিছুই লিখে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে আল্লাহ সৃষ্টির তাকদির লিখে রেখেছেন। (সহিহ মুসলিম)

তৃতীয় স্তর হলো ইরাদাহ বা ইচ্ছা। অর্থাৎ এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটে তা আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। তার ইচ্ছার বাইরে কোনো কিছুই হতে পারে না। তিনি যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কোনো বিষয়ে বলো না যে আমি তা আগামীকাল করব, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া।’ (সুরা কাহফ ২৩-২৪)

জেনে রাখুন, তকদিরে বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে, বান্দা তার কাজে বাধ্য, বরং আল্লাহ বান্দাকে ইচ্ছা ও বাছাই করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তবে তাদের ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়।

চতুর্থ স্তর হলো খালক বা সৃষ্টি। অর্থাৎ মহান আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা, তিনি ছাড়া কোনো স্রষ্টা ও রব নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ প্রতিটি বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা জুমার ৬২)

হে মুমিনরা! তকদিরে বিশ্বাসের অসংখ্য ভালো ফল রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মনের প্রশান্তি এবং যা হারিয়ে গেছে তার জন্য আক্ষেপ না করা। মুমিন তার প্রিয় কিছু হারিয়ে গেলে বা অপছন্দনীয় কিছু ঘটলে মুষড়ে পড়ে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য দুঃখিত না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য আনন্দিত না হও।’ (সুরা হাদিদ ২৩) এখানে যে দুঃখ ও আনন্দ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, তা হলো এমন দুঃখ ও আনন্দ, যা মানুষকে অবৈধ কাজ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

যে জানে সবকিছু তকদির অনুযায়ী হয়, তার জন্য কষ্ট সহ্য করা সহজ হয় এবং সে বিপদে ধৈর্য ধারণ করে। সে আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে কিছু বলে না বা করে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা বিপদে পড়লে বলে, আমরা তো আল্লাহরই এবং আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।’ (সুরা বাকররা ১৫৬)

তকদিরে বিশ্বাসের আরেকটি ভালো ফল হলো আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ যা পছন্দ করেন তাতেই কল্যাণ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর হতে পারে তোমরা কোনো কিছু পছন্দ করছ অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা ২১৬)

ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলতেন, ‘আমার সকালটা আমার পছন্দনীয় অবস্থায় হলো না কি অপছন্দনীয় অবস্থায়, তাতে আমি পরোয়া করি না। কারণ আমি জানি না, আমার পছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে কল্যাণ আছে নাকি অপছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে।’ এছাড়াও এটি বান্দাকে অল্পে তুষ্টি ও উপায়-উপকরণ গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ধনী হবে। (তিরমিজি) এটি অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পবিত্র করে, কারণ হিংসা মূলত আল্লাহর বণ্টনের ওপর আপত্তির নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের নিচের দিকে তাকাও (যারা দুনিয়াবি সম্পদে কম), ওপরের দিকে তাকিও না, এটি তোমাদের জন্য আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ না করার জন্য বেশি কার্যকর। (সহিহ মুসলিম ২৯৬৩)

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন। ইসলামের সীমানাকে রক্ষা করুন। আপনার কিতাব, আপনার নবীর সুন্নাহ এবং আপনার মুমিন বান্দাদের সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা দূর করুন, বিপদগ্রস্তদের বিপদমুক্ত করুন, ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে সাহায্য করুন এবং আমাদের অসুস্থদের সুস্থতা দান করুন। ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সব প্রান্তের মজলুম মুসলিমদের সাহায্য করুন। হে আমাদের রব! আমাদের দোয়া কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।

১৭ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত