বাংলাদেশ বর্তমানে তার বৈদেশিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও গৌরবময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের যে চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য গতানুগতিক ‘উন্নয়ন সহায়তা’ নির্ভর মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে এক গভীর ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ পদার্পণ করছে বাংলাদেশ। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় ‘পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট’ (পিসিএ) শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক দাপ্তরিক চুক্তি নয়, এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন এক মর্যাদাপূর্ণ পরিচয়। যেখানে আমরা কেবল সহায়তার গ্রহীতা নই, বৈশ্বিক রাজনীতির এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী অংশীদার। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এই মর্যাদা অর্জন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারক বা ‘গ্লোবাল এলিট সার্কেল’-এর সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক সাফল্যের মূলে রয়েছে এক দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের চিন্তা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রদর্শিত ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের নীতির ওপর ভিত্তি করেই এই মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে, তার সুফলই এই পিসিএ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক এই অংশীদারত্বে উদ্বুদ্ধ করেছে। এটি এমন এক নেতৃত্বের ফসল, যা আগামী দশকের এক সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের রূপরেখা অঙ্কন করে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এই চুক্তির প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ তহবিল ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ এখন বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত। এই সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরাসরি গ্রিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হবে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং লোডশেডিং সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও পুঁজির সরাসরি বিনিয়োগ আসার পথ প্রশস্ত হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, প্রতি বছর ২ বিলিয়ন ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের শিল্প খাতকে ঢেলে সাজাবে এবং সৃষ্টি করবে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান। কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, এই অংশীদারত্বে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষায় ইইউ-র সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করবে। পিসিএ চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের শ্রমবাজারের গুণগত মান উন্নয়নে ব্যাপক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কেবল অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করা টেকসই কোনো সমাধান নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হলো বাংলাদেশের যুবসমাজকে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলা। এই চুক্তির ফলে আমাদের তরুণরা ইউরোপের উন্নত প্রযুক্তি ও উন্নত কর্মপরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মেধা ও মননের আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে এই অংশীদারত্ব এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মানদণ্ড বা ‘ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড’ অনুসরণ করে আমাদের কৃষিপণ্য যদি সরাসরি তাদের বাজারে প্রবেশ করতে পারে, তবে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন। এটি কেবল রপ্তানি আয় বাড়াবে না, বরং গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে এক ভারসাম্যপূর্ণ ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জন করতে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে যে মেরুকরণ চলছে, সেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল না হয়ে ইউরোপের মতো একটি বৃহত্তর শক্তির সঙ্গে এই গভীর মৈত্রী আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা এখানে স্পষ্ট, তিনি বাংলাদেশকে কোনো আঞ্চলিক দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের ওপর আস্থা রেখে এই চুক্তিতে উপনীত হয়, তখন আমাদের দায়িত্ব বাড়ে সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়া। সুতরাং, এই নতুন কূটনৈতিক যাত্রা কেবল সরকারের সাফল্য নয়, এটি পুরো জাতির জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি, তবে ২০৪১ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ আর বিশ্বব্যবস্থার শুধুই নিছক পর্যবেক্ষক নয়, সক্রিয় নীতিনির্ধারকও বটে। আগামী এক দশকে এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের ‘উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। ইউরোপের সঙ্গে এই নতুন মৈত্রী হবে, আগামী দিনের অগ্রযাত্রার অবিচল ভিত্তিপ্রস্তর।
লেখক : ভিপি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন
