রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৬ এএম

রাখাইন রাজ্যের বুথিডং টাউনশিপের কাছে ছবির মতো ছোট গ্রামটির নাম নওংডং। গ্রামের চারপাশে ধানক্ষেত, পাহাড় আর নরম সবুজ বাঁশঝাড়ের সারি। বর্ষাকালে পুরো এলাকা যেন জল রঙে আঁকা ক্যানভাস হয়ে যায়। ছোট ছোট খাল বেয়ে পানি  নেমে আসে, আর গ্রামের মাটির পথগুলো আয়নার মতো চকচক করে। হুসাইনের মনে হতো তাদের গ্রামটা যেন এক শান্ত পোস্টকার্ড যেখানে আকাশ আর জমি এক সঙ্গে মিলে গেছে। নওংডং অঞ্চলের এক প্রান্তে হুসাইনের জন্ম। ডেটা সিকিউরিটি ও এনক্রিপশন সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করতে করতে সে যে কখন এতটা দক্ষ হয়ে উঠেছে, তা নিজেও টের পায়নি। রাখাইনের এই ছোট গ্রামে সীমিত ইন্টারনেট সুযোগের মধ্যেই সে নিজের শেখা চালিয়ে যেত। পুরনো ল্যাপটপ আর অনলাইন ডকুমেন্টেশনের ভাঙা ভাঙা সূত্র ধরে হুসাইন এমন কিছু কোড তৈরি করে, যা একসময় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ফোরামে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি তার দিকে যায়; তার অসামান্য দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে গুগল তাকে সরাসরি অফিসে এনে স্থায়ীভাবে কাজের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু পাসপোর্ট করতে গিয়ে হুসাইন প্রথমবারের মতো কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। নিজের পরিচয় প্রমাণের প্রতিটি ধাপে বারবার আটকে যেতে যেতে, তার মনে জন্ম নেয় এক গভীর শূন্যতা। দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনের সেই মুহূর্তেই হুসাইন তীব্রভাবে অনুভব করে, হুসাইনের কোনো রাষ্ট্র নেই। নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ আইনগত কাঠামো মূলত মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন, ১৯৮২ এর ওপর ভিত্তি করে গঠিত।

আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব লাভের জন্য মিয়ানমার সরকার কর্র্তৃক ‘স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর’ অন্তর্ভুক্ত হওয়া আবশ্যক। সরকার প্রায় ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যেখানে রোহিঙ্গাদের নাম নেই। ফলে আইনি বাস্তবতায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের  নাগরিকত্বের বাইরে অবস্থান করছে। এই আইনে ‘স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী’ ধারণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। নীতিগতভাবে বলা হয়, ১৮২৩ সালের আগে অর্থাৎ ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের পূর্বে যেসব জনগোষ্ঠী মায়ানমারে বসবাস করত, তারাই জাতীয় জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। মিয়ানমার সরকারের দাবি অনুযায়ী রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ আমলে অভিবাসিত জনগোষ্ঠী, তাই তারা আদিবাসী হিসেবে গণ্য নয়। তবে এই দাবির ঐতিহাসিক ভিত্তি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নয় এবং আধুনিক নাগরিকত্বের সমতা ও অধিকারভিত্তিক নীতির সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক বলে সমালোচিত হয়। এছাড়া, মিয়ানমারের সংবিধান, ২০০৮-ও ‘স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী’ ধারণাকে রাষ্ট্র কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক পর্যায়ে আইন প্রয়োগের সময়ও রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করার একটি কাঠামোগত প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা তাদের আইনি ও সামাজিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইনের নওংডংয়ের কাছের গ্রামগুলোতে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে আসে। দূরে ধোঁয়ার রেখা দেখা যেতে থাকে, আর ২৬-২৮ আগস্টের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। রাত নামলেই আগুনের লাল আভা আর কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যেত। বিশেষ করে বুথিডং ও মংডু এলাকার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আগুন এত দ্রুত ছড়াত যে মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘরবাড়ি পুড়ে যেত। নিজ চোখে গ্রামের ধ্বংস আর মানুষের অসহায়তা দেখতে দেখতে হুসাইন বোধহীন হয়ে পড়ে, যেন সে এক নিঃশব্দ যন্ত্র। কখন তার স্বপ্নগুলো আগুনে পুড়ে গেছে, সে বুঝতেই পারেনি। বাঁচার তাগিদে সেও লাখো মানুষের সঙ্গে ভেসে যায়। যারা পেছনে ফেলে এসেছে জন্মভূমি, স্মৃতি আর পরিচয়। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছে তার কাছে অবশিষ্ট থাকে শুধু জীবন, আর বুকভরা এক অদৃশ্য শূন্যতা। নিজের দেশ হারানোর বেদনা। বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও সীমিত সম্পদের দেশ হয়েও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন সংকটে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সীমান্ত খুলে প্রায় ৭-৮ লাথ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়, যা এখন বেড়ে ১০-১২ লাখে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংক  স্বীকার করেছে, এই উদ্যোগ হাজারও প্রাণ রক্ষা করেছে। তবে এর ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে; ২০২৫ সালেই প্রয়োজন ছিল প্রায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলার। এই সংকট পরিবেশেও প্রভাব ফেলেছে। কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির, বনভূমি উজাড় হয়েছে, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ বেড়েছে। তবুও খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশনের মাধ্যমে বড় দুর্ভিক্ষ বা মহামারী এড়ানো গেছে। ভাসানচরে পুনর্বাসন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের উদ্যোগে। সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপও বেড়েছে। কর্মসংস্থান সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অপরাধের ঝুঁকি। তবুও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিলসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছে, যদিও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা। রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের মর্যাদা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ, ১৯৫৪ এর আলোকে রোহিঙ্গাদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট কিন্তু বেদনাদায়ক বাস্তবতা সামনে আসে। সনদের অনুচ্ছেদ-১ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি’ হলো সেই মানুষ, যাকে কোনো রাষ্ট্র তার আইনের অধীনে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন, ১৯৮২-এর কারণে রোহিঙ্গারা কার্যত এই সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। ফলে রোহিঙ্গারা তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারেই আইনগতভাবে রাষ্ট্রহীন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের মর্যাদা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ, ১৯৫৪ কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ না হয়েও মানবিকতার নীরব নীতিকে অনুসরণ করে আশ্রয় দিয়েছে লাখো হুসাইনকে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। এই আত্মত্যাগের একটি সীমা আছে, এবং একটি দেশ তার সামর্থ্যরে চেয়েও বেশি দায়িত্ব চিরকাল বহন করতে পারে না। যদিও মানবতার আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা বাংলাদেশ আজও অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সনদের অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮-এ রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের জন্য পরিচয়পত্র ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভ্রমণ নথি প্রদানের কথা বলা হয়েছে, যাতে তারা আইনি পরিচয় ও চলাচলের ন্যূনতম অধিকার পায়। পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও আদালতে প্রবেশাধিকারের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথাও সনদে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা এসব অধিকারের অধিকাংশ থেকেই বঞ্চিত। নিজ দেশে তারা নাগরিক নয়, আর সামর্থ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সীমিত অধিকার নিয়ে বসবাস করছে এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই। এই শূন্যতা থেকেই একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পরিচয় ও চলাচলের সুযোগের অভাবে কিছু রোহিঙ্গা অবৈধ বা জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশের পাসপোর্ট সংগ্রহের চেষ্টা করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও তদন্ত প্রতিবেদনে এ ধরনের জালিয়াতি চক্র, জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করা, এমনকি অবৈধ উপায়ে পাসপোর্ট পাওয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল আরও স্পষ্ট, দায়িত্বশীল ও কার্যকর।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের নেতৃত্বে রাষ্ট্রহীনদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ট্রাভেল ডকুমেন্ট কার্যকরভাবে চালু করা, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো, এবং মিয়ানমারের ওপর সমন্বিত কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে নাগরিকত্ব আইনের সংস্কার নিশ্চিত করা এসব ছিল জরুরি পদক্ষেপ। বাস্তবে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল মানবিক সহায়তা (খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা) দিয়ে গেলেও, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য তা অপ্রতুল। আর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান যেমন নিরাপদ প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ বা বৈধ আন্তর্জাতিক চলাচলের সুযোগ এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি এখনো হয়নি। অর্থাৎ, ১৯৫৪ সালের সনদ রাষ্ট্রহীন মানুষের অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিলেও, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। বাংলাদেশ তার সামর্থ্যরে চেয়েও বেশি দিয়ে প্রমাণ করেছে ‘মানবতা’ কেবল একটি শব্দ নয়, বাস্তব দায়িত্ব। বিশ্ব যদি সেই দায়িত্ব ভাগ না করে, তবে হুসাইনদের গল্প কেবল পালিয়ে বেঁচে থাকার এক করুণ অধ্যায় হয়ে থাকাবে। মানবাধিকার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কাগজ থেকে বাস্তবে আসে। আর রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সেই পথ এখনো অসম্পূর্ণ।

লেখক:  আইন পরামর্শক এবং পাসপোর্ট ও অভিবাসন নথি বিশেষজ্ঞ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত