কৃষককে ন্যায্যমূল্য দিন

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪০ এএম

হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুম প্রতি বছরই এক ধরনের উৎসবের আবহ তৈরি করে। কিন্তু সেই উৎসবের আনন্দ খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যায় যখন কৃষক বাজারে গিয়ে তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। চলতি মৌসুমেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের বাজারদর তার নিচে নেমে গেছে, ফলে কৃষক বাধ্য হচ্ছেন লোকসানে ফসল বিক্রি করতে, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং কৃষিতে অনীহা তৈরি করছে। কৃষকদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সার, সেচ ও শ্রম সব খাতেই খরচ বেড়েছে। প্রতি মণ ধান তাদের ৭০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, যেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন খরচই প্রায় ১৩০০ টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ কৃষক শুধু লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না, মূলধনও হারাচ্ছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন; ঋণের চাপের কারণে তারা ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সরকারি ক্রয়নীতির সময় নির্ধারণে পদ্ধতিগত ত্রুটি। সরকার মূলত দুটি উদ্দেশ্যে ধান ও চাল ক্রয় করে একদিকে খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা, অন্যদিকে কৃষককে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কারণ, ফসল কাটার পরে সরকার যখন ক্রয়মূল্য ঘোষণা করে এবং কার্যক্রম শুরু করতে আরও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় নেয়, তখন পর্যন্ত বাজারে ধানের দাম অনেকটাই পড়ে যায়। এই সময়েই অধিকাংশ কৃষক, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ঋণগ্রস্তরা, বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন। ফলে যখন সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয় বা বাজারে দাম কিছুটা বাড়তে থাকে, তখন কৃষকের হাতে আর বিক্রিযোগ্য ধান থাকে না। এই বাস্তবতায় সরকারের নির্ধারিত মূল্য কার্যত কৃষকের কোনো উপকারে আসে না। উপরন্তু, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা ও কঠোর শর্তের কারণে অনেক কৃষক সরাসরি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও প্রকৃত উৎপাদক বঞ্চিত হন।

প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। ভারতে ফসল কাটার আগেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করা হয়, যা কৃষকদের বাজারে দরকষাকষির শক্তি বাড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াটি উল্টো হওয়ায় কৃষক বাজারে দুর্বল অবস্থানে থাকেন। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি নেওয়ার পরও তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এই ধারাবাহিক বঞ্চনার প্রভাব এখন কৃষি খাতেই পড়তে শুরু করেছে। অনেক কৃষক ধান চাষ থেকে সরে গিয়ে ভুট্টার মতো ক্যাশ ক্রপের দিকে ঝুঁকছেন। এটি স্বল্পমেয়াদে তাদের জন্য লাভজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ধানই দেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এর উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত জরুরি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি কিছু নীতিগত পরিবর্তন। প্রথমত, ফসল কাটার আগেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম দ্রুত শুরু এবং বিস্তৃত করতে হবে, যাতে বেশি সংখ্যক কৃষক এর আওতায় আসতে পারেন। তৃতীয়ত, ক্রয় প্রক্রিয়া সহজ ও কৃষকবান্ধব করতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমে।কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা গেলে শুধু তাদের জীবন-জীবিকাই নয়, পুরো দেশের খাদ্যব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সময় এসেছে নীতির পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। নচেৎ প্রতি বছর একই চক্রে কৃষকের বঞ্চনা চলতেই থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত