অনেক নতুন এমপির মন ভরছে না

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫৫ এএম

নিজেরা তখন সংসদ সদস্য ছিলেন না, কিন্তু জাতীয় সংসদের বিতর্ক তাদের টানত। এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করতেন। সেই আকর্ষণেই কেউ কেউ বিতর্ক দেখতে অপেক্ষায় থাকতেন টেলিভিশনের সামনে। কখন পছন্দের ব্যক্তিটি কথা বলবেন। তথ্য ও হাস্যরসের সঙ্গে প্যাঁচ কষবেন প্রতিপক্ষের ঝানু কারও কথার ওপর। আর দল নির্বিশেষে অন্য সদস্যরা মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাবেন।

এবার নিজেরাই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে। চলছে প্রথম অধিবেশন। সবই হচ্ছে, যা যা হওয়ার কথা সংসদীয় রীতি-নীতি মেনে প্রশ্নোত্তর পর্ব, আইন প্রণয়ন। পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে এবং জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সদস্যরা কথা বলছেন। মন্ত্রিরা জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু কেন যেন মন ভরছে না এবারই প্রথম নির্বাচিত হয়ে আসা এমপিদের কয়েকজনের।

প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন এমন প্রায় দেড় ডজন এমপির সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের। জানিয়েছেন অধিবেশন কক্ষে তাদের কেমন অনুভূতি হয়। তারা বলেছেন, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তারকাখ্যাতি পাওয়া বেশ কয়েকজন আগে অধিবেশন মাতিয়ে রাখতেন, তাদের কেউ-ই এখন নেই। যাদের দেখে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসার আগ্রহ বোধ করতেন, যাদের কথার মারপ্যাঁচ ও হাস্যরসের কারণে সংসদের প্ল্যানারি থেকে টেবিল চাপড়ানোর শব্দ রেডিও-টেলিভিশন হয়ে বহুদূরের জনপদে আনন্দ ছড়াত, বিস্ময় জাগাত, তাদের প্রায় সবাই নেই এ সংসদে।

কয়েকজন এমপি জানান, পূর্বসূরিদের ভীষণ মনে পড়ছে। তারা নেই বলেই হয়তো কোথায় যেন কমতি-ঘাটতি আছে অধিবেশনে। নিষ্প্রাণ। অনেকটা যান্ত্রিক। আর স্বতঃস্ফূর্ততার অভাবও দেখা যাচ্ছে।

বিএনপির সহযোগী সংগঠন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও ভোলা-৪ আসনের এমপি নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে সংসদে এসে খুব মিস করছি।’ তিনি বলেন, ‘টিভি পর্দায় যখন সংসদ অধিবেশন দেখতাম টেবিল চাপড়ানো ও রসকষ মেখে অনেকের দেওয়া বক্তব্য বেশ উপভোগ্য ছিল। যাদের বক্তব্য শুনে খুব মজা পেতাম, তারা বক্তব্য দিতে দেরি করলে ছটপট করতাম। কয়েকজনের বক্তব্য এতটাই আকর্ষণ করত, তা শোনার জন্য টিভির সামনে বসেই থাকতাম।’

বর্তমান ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন এমন সদস্য প্রায় ২২০ জন।

কয়েকজন এমপি বলেছেন, বারবার নির্বাচিত হয়ে ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান হয়ে ওঠা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদের কথা, যাদের বিকল্প হতে পারতেন, এমন কেউ নেই এবারের সংসদে। এর ফলে সংসদ অধিবেশন প্রাণহীন রূপ নিয়েছে।

পঞ্চগড়-২ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি ফরহাদ হোসেন আজাদ জানান, তিনি সংসদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার শূন্যতা অনুভব করেন। সেই সঙ্গে স্মরণ করেন নিজ জেলা থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে আসা সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারকে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া আজাদ বলেন, ‘বিশিষ্ট ও অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানদের ভীষণ অভাব বোধ করি। সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অধিবেশন মাতিয়ে রাখতেন যারা, তারা না থাকায় জানা বোঝার ব্যাপারটা সময় নেবে।’

কয়েকজন এমপি স্মরণ করেছেন মো. আবদুল হামিদকে, যিনি কিশোরগঞ্জের একটি আসন থেকে ১৯৭০ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হন। এরপর বারবার এমপি হয়ে ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার এবং একপর্যায়ে দেশের রাষ্ট্রপতি হন।

মানিকগঞ্জের একটি আসন থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসা সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকেও স্মরণ করেছেন অনেকেই।

সংসদের সব কিছু নিয়মের মধ্যেই চলছে এমনটি জানিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াত এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘নতুন সংসদে আসলাম। কিছু কিছু ব্যাপারে এখনো অতৃপ্তি রয়ে গেছে। আগে সংসদ অধিবেশনগুলোতে এমপিদের বক্তব্য অধিবেশনের বাইরে থেকে খুব মজা পেতাম। এখন সে ধরনের অনুভূতি হচ্ছে না।’

দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার আরেক নতুন এমপি বলেন, চলতি অধিবেশনে কথার মারপ্যাঁচ নেই। শ্রুতিমধুর শোনায় না এমপিদের বক্তব্য।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীও আছেন। কথা হওয়া বেশিরভাগ এমপি বলেন, সংসদে তারা নতুন। অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলে অন্য এমপিরা কীভাবে নেয় ব্যাপারটি, তা নিয়ে নানা সংশয়ে থাকেন অনেকে। ঝামেলা-রোষানলে পড়তে পারেন, এই ভয়েও খোলামেলাভাবে বক্তব্য দেওয়ায় অনীহা আছে কারও কারও।

নুরুল ইসলাম নয়ন অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সময় যেতে যেতে অভিজ্ঞতা অর্জন করার মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন আবার রসকসে ভরে উঠবে।

অন্য কয়েকজন এমপি অবশ্য বলেন, সংসদীয় কাজে অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকের হবে, তবে মওদুদ, সাকা চৌধুরী ও সুরঞ্জিতের মতো পার্লামেন্টারিয়ান আবার কবে তৈরি হবেন, সেটি অনিশ্চিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত