পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষ পর্যন্ত হয়নি। আদৌ এ সংলাপ আর হবে কি না, সে বিষয়ে বেশ অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এটাও বলেছেন, ইরান একটি চুক্তি না করা পর্যন্ত নৌ-অবরোধ চলতে থাকবে।
সেই সঙ্গে ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণাও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ স্যোশালে বাংলাদেশ সময় গত মঙ্গলবার রাতে দেওয়া পোস্টে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে ‘যেকোনো উপায়ে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত’ দেশটির বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ২২ এপ্রিল রাত ৮টায় এ যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা ছিল। তার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিলেন। তবে এবার যুদ্ধবিরতি কতদিন চলবে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালালে এ যুদ্ধ শুরু হয়। গতকাল বুধবার ছিল পারস্য উপসাগর অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের ৫৪তম দিন। যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় বিশ^জুড়ে অর্থনীতিতে এবং জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
ইরান সরকার ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত’ এমন দাবি নিজের পোস্টে করে ট্রাম্প বলেন, তিনি এ যুদ্ধের একটি কূটনৈতিক সমাধান চান। তিনি আবার এমন কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে আগ্রহী নন, যা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নয়।
ট্রাাম্পের মতে, ইরানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা এবং ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুদ নিয়ে আলোচনার টেবিলে আলোচকদের কতটুকু ক্ষমতা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে দেশটির নেতারা একমত হতে পারছেন না। শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আরও মনে করছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির আড়ালে থাকার প্রবণতা ইরান সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনাকে বাধাপ্রস্ত করছে।
তবে সিএনএন বলছে, আলোচনার এই সাময়িক ব্যর্থতা ট্রাম্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ তিনি এমন একটি চুক্তি করতে চান, যাতে তার সব শর্ত পূরণ হবে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও সংলাপ ইস্যুতে গতকাল বুধবার পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ইরান। এ বিষয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, ‘ইসলামাবাদে প্রথম দফা সংলাপকে খুব গুরুত্ব দিয়ে ইরান প্রতিনিধিরা সদিচ্ছা নিয়েই গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাদের এমন একটি পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করতে হয়েছে, যাদের সদিচ্ছা তো নেই-ই, এমনকি সংলাপের গুরুত্ব বুঝতেও তারা অক্ষম।’
ইরান দাবি করেছে, নতুন করে আলোচনায় বসার আগে ট্রাম্পকে অবরোধ তুলে নিতে হবে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি বলেন, ওয়াশিংটন অবরোধ তুললেই কেবল পরবর্তী দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তবে নতুন কোনো আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে।
ইরাভানি বলেন, ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক সমাধান চায়, ইরান তার জন্য প্রস্তুত। আর যদি তারা যুদ্ধ চায়, ইরান সেটির জন্যও তৈরি।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ ইরানের অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহে সহায়তা করার অভিযোগে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সংঘাত বন্ধে বড় ধরনের ছাড় পেতে ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর যে কৌশল ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছেন, এ নিষেধাজ্ঞা তারই অংশ।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ অবশ্য গতকাল বলেছেন, পাকিস্তান একটি আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতি পালন অব্যাহত রাখবে এবং সংঘাতের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে ইসলামাবাদে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় একটি ব্যাপক ‘শান্তিচুক্তি’ সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
এদিকে গতকাল সতর্কতা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করায় তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হামলার পর দুটি জাহাজ জব্দের দাবি করেছে বাহিনীটি। ইউফোরিয়া, এমএসসি ফ্রান্সেসকা এবং এপামিনোন্ডাস নামের জাহাজ তিনটি ‘জব্দ’ করা হয়েছে, এমন দাবি করেছে তারা।
কার্গো ট্র্যাকিং গ্রুপ ভর্টেক্সা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ উপেক্ষা করে হরমুজ পার হয়েছে ৩৪টি ইরানি জাহাজ। অন্তত ১৯টি ইরানি ট্যাংকার অবরোধ এড়িয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বেরিয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত ছয়টি ট্যাংকারে মোট ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। এর বাইরে ১৫টি ট্যাংকার আরব সাগর থেকে ইরানের দিকে প্রবেশ করেছে।
অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করা এবং সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় বের করতে বৈঠকে বসেছে ৩০টিরও বেশি দেশ। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে দুই দিনের এ বৈঠক গতকাল লন্ডনে শুরু হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক পরিকল্পনাবিদরা।
ইউরোপ, এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৫০টি দেশ হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মিশনের সদস্য হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
