দক্ষিণ বন বিভাগের দুই সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. অভিউজ্জামান ও মো. শাহিনুর ইসলাম কক্সবাজারের রামুর রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জের বন রক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন। তারা ৪১তম বিসিএসের ক্যাডার। বন রক্ষক হলেও তাদের হাতেই উজাড় হচ্ছে বনের সম্পদ। টাকার জন্য তারা নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন বলে দাবি স্থানীয় লোকজনের এবং বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এ নিয়ে তদন্তকমিটিও গঠন করেছে দক্ষিণ বন বিভাগ।
২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে দক্ষিণ বন বিভাগের কক্সবাজারের রামুর রাজারকুল রেঞ্জের দায়িত্ব নেন মো. অভিউজ্জামান। একই দিনে উখিয়া রেঞ্জের দায়িত্ব নেন মো. শাহিনুর ইসলাম। দায়িত্ব নেওয়ার পরই বনের জমিতে বসবাসরত প্রায় ৫০টি পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তারা। অন্যান্য বসতবাড়িতেও অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন ওই দুই কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের ভয়কে পুঁজি করে টাকা আয়ের দিকে ঝুঁকেন তারা। নতুন ঘর নির্মাণের জন্য একটি অলিখিত তালিকা করেন তারা এবং কাঁচা ঘরের জন্য সর্বনিম্ন ৫০ হাজার ও সেমিপাকা ঘরের সর্বনিম্ন এক লাখ টাকা চাঁদা নিতে শুরু করেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ঘরগুলো উচ্ছেদ করেন কিংবা তালিকা না করে উল্টো মোটা অংকের টাকা নিয়ে ঘরমালিকদের আবার বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সহযোগিতা করেন। গত বছরের ১৮ জুন ওই দুই সহকারী বন সংরক্ষক ছয় মাসের ট্রেনিংয়ে যান এবং ফিরে আসেন ১৮ ডিসেম্বর। ফিরে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বিক্রি করতে শুরু করেন বনের জমি ও গাছ।
তারা পাহাড়ে বসবাসকারী লোকজনকে জিম্মি করে টাকার বিনিময়ে দিচ্ছেন ঘর বানানোর অনুমতি, পানের বরজ কিংবা চাষবাস করতে নিচ্ছেন চাঁদা, লাকড়ি আনার দায়ে কাঠুরিয়াকে শাস্তি দিলেও টাকার বিনিময়ে গাছ পাচারের অনুমতিও দিচ্ছেন। টমটমচালকদের অকারণে আটকে রেখে আদায় করছেন চাঁদা।
এ দুই কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে বালুবাহী ডাম্পার ও কাঠবাহী ট্রাক ছেড়ে দেন, টাকার বিনিময়ে বনে ঘর নির্মাণের অনুমতি দেন এবং ফানির্চারের দোকান ও স’মিল থেকে এবং বনের জমিতে মৌসুমি সবজি চাষি কিংবা পানের বরজ করা লোকজনের কাছ থেকে নিজেদের লোক দিয়ে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করেন।
তাদের ব্যাচমেট আরেক সহকারী বন সংরক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিসিএস দিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছি মাত্র। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শিখছি। অথচ অভি ও শাহীন মেতেছে টাকা কামাইয়ের নেশায়। এদের ভয়-ডর নেই। চাকরির প্রথম বছরেই নানা উপায়ে দুই কোটি টাকার ওপরে হাতিয়ে নিয়েছে তারা।’
ওই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে জানতে গত এক সপ্তাহ রামু ও উখিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ঘুরেছেন এ প্রতিবেদক।
দেখা গেছে, উখিয়ার ছনখোলা, শেয়ালিয়াপাড়া, থ্যাংখালী তেলখেলা, বালুখালী, জুমরছড়া, কুতুপালং স্বর্ণপাহাড়, দোছরি, হরিণমারা, ডেইলপাড়া, যোগবুনিয়া, হরইবুনিয়া, জারাইলতলি, মধুরছড়া, ভালুকিয়া আমতলী এবং হলদিয়াপালংয়ের বউবাজার ও নাপিতপাড়ায় পাহাড় কাটা ও ভবন নির্মাণের মহোৎসব চলছে।
জানা গেছে, তিন লাখ টাকা নিয়ে উখিয়ার রতœাপালং ইউনিয়নের কুতুপালংয়ের স্বর্ণপাহাড়ের সংরক্ষিত বনে অট্টালিকা নির্মাণে সহযোগিতা করছে দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ। কুতুপালংয়ের বালুখালী মরাগাছতলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়া-লাগোয়া রোহিঙ্গা মার্কেটের ভেতরে বন বিভাগের জায়গায় হাজী নুরুল হকের বহুতল ভবন নির্মাণের কাজে প্রথমে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে পরে মোটা অংকের টাকা আদায় করেছেন উখিয়ার রেঞ্জ অফিসার। ভবন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। গত ১১ এপ্রিল রাত ২টায় রাজারপালং ইউনিয়নের হাতিমুড়া থেকে আব্দুল শুক্কুরের (গুলি শুক্কুর) মালিকানাধীন মাটিভর্তি একটি ডাম্পার আটক করেন উখিয়া রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহীনুর ইসলাম। পরে ফরেস্ট গার্ড জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়, যার ভিডিও প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। শুকনো কাঠ পরিবহনের দায়ে টমটম আটক করে টাকা আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাষিদের কাছ থেকে বন বিভাগের ফরেস্ট গার্ড জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে মাসোয়ারা আদায় করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযুক্ত সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহীনুর ইসলাম বলেন, ‘বালুখালীতে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ অভিযান হয়েছিল। আমি তখন ট্র্রেনিংয়ে ছিলাম। শুনেছি, ওই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। চলতি বছরে আমি একাধিক ডাম্পার জব্দ করে বন আইন অনুযায়ী মামলা করেছি। কিন্তু সেদিন একটি ডাম্পারকে ধাওয়া করলেও সেটি গ্রামে ঢুকে যাওয়ায় আমরা আটক করতে পারিনি। তবে গত ১৪ জানুয়ারি রাজারকুল বিটে যৌথ অভিযানে একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়। পরে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।’
তিনি বলেন, ‘আমি যা করি বন আইন মেনেই করি। বসতবাড়িতে কী করে বিদ্যুৎসংযোগ আবার গেল আমার জানা নেই।’
ঘর নির্মাণ ও গাছভর্তি ট্রাক এবং ফার্নিচারের গাড়ি থেকে টাকা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এসব অপপ্রচার। তবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন জন বন বিভাগের নাম বলে টাকা আদায় করে বলে শুনেছি। অভিযোগ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারিনি।’
বনকর্মীরা বলেন, শাহীনের চেয়েও বেপরোয়া অভিউজ্জামান। তার বিরুদ্ধে একাধিক লিখিত অভিযোগ পেয়েছে দক্ষিণ বন বিভাগ, যার তদন্তে একটি টিম গঠন করা হয়েছে।
গত এক সপ্তাহ সরেজমিন রামু ঘুরে দেখা গেছে, পাঞ্জেখানা, ছাগলিয়াকাটা, ঘোনারাপাড়া, চকিদারপাড়া, ডালার মুখ, আদর্শগ্রাম, হাতির ডেবা, চিকন ঘোনা, জম্মাপাড়া, লম্বা ঘোনা, মকচর, জুম্মাপাড়া, পূর্ব পাড়া, দারিয়ার দীঘি পূর্ব পাড়া, পাইনবাগান, টংগাডেবা, বাদিতলা, বাদিতলা ঘোনারপাড়া, কেচুয়াবুনিয়া, খেদার ঘোনা, সাদির কাটা, কালারপাড়া, ছনখোলা, কালুয়ার খোলা, গুটাবুনিয়া, আবুল বন্দর, তেল খোলা, দারিয়ার দীঘি দক্ষিণপাড়াসহ নানা জায়গায় সংরক্ষিত বনভূমিতে স্থানীয়সহ রোহিঙ্গারা বসতবাড়ি নির্মাণ করছে। অনেকে মৌসুমি সবজি চাষের, পানের বরজের কাজ করছে। রাতের আঁধারে পাচার হচ্ছে কাঠ, মাটি ও তৈরি ফানির্চার। সংশ্লিষ্টরা বীরদর্পে কাজ করলেও ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে টমটমচালক ও জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী কাঠুরিয়ারা।
বন বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রামুর আপাররেজু বনবিটে থোয়াইংগা কাটা জামে মসজিদের পুব পাশের আবদুল হামিদ মনুকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে এক্সকেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটার অনুমতি দিয়েছে রাজারকুল বিটের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) অভিউজ্জামান। টাকা গ্রহণ করা হয়েছে আপাররেজু বনবিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদের মাধ্যমে।
গত ২৫ মার্চ রাত ২টায় খুনিয়াপালং ইউনিয়নের থোয়াইংগাকাটা বাজারের আবদুল হক সওদাগরের চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন হাতির ডেবর বাসিন্দা প্রতিবন্ধী বাবুল ও রমজান আলী। সেই সময় অভিউজ্জমান ও আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ একটি সরকারি গাড়িতে করে সেখানে যান। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই দুই যুবককে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দর কষাকষি করে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
গত ১১ মার্চ দুপুরের দিকে খুনিয়াপালংয়ের মির্জা আলীর দোকান এলাকার জমিরউদ্দীন নামের এক টমটমচালককে পূর্ব ধেচুয়াপালং বানিয়া এলাকা থেকে জোরপূর্বক রাজারকুল রেঞ্জ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার টমটমটি ৯ দিন আটকে রেখে ১৬ হাজার টাকা আদায় করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে থোয়াইংগাকাটা ঘুটাবুনিয়ার বাসিন্দা মৃত আলী মিয়ার ছেলে আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমার টমটম গাড়ি স’মিলের সামনে থেকে চালক ও চাবি ছাড়া জোরপূর্বক রেঞ্জ অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বন কর্মচারী ইমরান ও চালক কলিম উল্লাহর মাধ্যমে গাড়িটি ছাড়িয়ে আনি।’
গত ১৪ জানুয়ারি রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জ যৌথ অভিযান চালিয়ে রামুর খুনিয়াপালং থেকে জনৈক সাইফুল ইসলামের একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়। পরে তিন ধাপে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়। সদর, রামু ও ঈদগাঁও ফার্নিচারের দোকান মালিকদের সঙ্গে মাসিক চুক্তি করেছে রাজারকুল রেঞ্জের এসিএফ। মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে ঈদগাঁওয়ের ফার্নিচার ব্যবসায়ী নুরুচ্ছফাসহ তিনজন। প্রত্যেকে ৪০ হাজার টাকা মাসোয়ারা দেন।
‘ভ্যালিজার’ নামে ব্যক্তিপ্রতি ২০, ৩০এমনকি ৫০ হেক্টর বনভূমি ভাড়া দিয়েছেন তিনি। মাসের শুরুতেই ভ্যালিজারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে রয়েছে মোজাফফর নামে এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে ফরেস্ট গার্ডরাও থাকেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে পানচাষিরা জানান, বরজ শুরু করতে হলে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে অগ্রিম টাকা দিতে হয়। এরপর প্রতি মাসে নির্ধারিত অংকের টাকা দিতে হয়। না দিলে বরজ চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজারকুল রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. অভিউজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আইন মেনে কাজ করতে গিয়ে কিছু প্রভাবশালী আমার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এরাই আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এখন রামুতে পাহাড় কাটাসহ অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে, খবর নিলেই জানতে পারবেন।’
দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘রাজারকুল রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. অভিউজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান টেকনাফের সহকারী বন সংরক্ষক।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধীর গাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তবে টাকার বিনিময়ে নয়। অন্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।’
উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘শাহীনুরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে নানাভাবে কিছু তথ্য কানে এসেছে। আমরা সেগুলো যাচাই করছি।’
তিনি বলেন, আপনাদের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ের সংরক্ষিত বনে অট্টালিকা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মামলা করা হয়েছে। ভবনটি ভাঙার অনুমতিও চাওয়া হয়েছে। তবে দোতলা পর্যন্ত কীভাবে নির্মিত হলো, এর সঙ্গে বন বিভাগের কারা জড়িত তদন্ত করা হবে।’