জ্বালানি অস্থিরতায় মুক্তির পথ

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ এএম

বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর একটি ছোট্ট দেশ। বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপট এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশে^র অনেক উন্নত দেশ একই সমস্যায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ইরান যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, শিগগিরই দূর হবে না বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হলেও, এই সংকট কাটতে অন্তত ছয় মাস কিংবা আরও অধিক সময় লেগে যেতে পারে। প্রকৃত অর্থে, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আগামীতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের ব্যবস্থাপনাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। সুতরাং জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। বিকল্প হিসেবে যে রাশিয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটিও এক যুদ্ধবিগ্রহ অঞ্চল। এ ছাড়া

ভূ-রাজনীতি, কূটনীতি, ভূ-অর্থনীতি এবং বৈদেশিক রাষ্ট্রস্বার্থের অগ্রাধিকারের কারণে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে, যেকোনো সময় বিপদে পড়তে হতে পারে। সুতরাং আমাদের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে ভাবতে হবে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আসা থমকে গেছে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বিপদ মোকাবিলার জন্য আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা ও কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হবে। এ ছাড়া স্পট মার্কেট কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন বিশ্ববাজারে দাম যখন কম থাকে, তখন স্পট মার্কেট থেকে বড় পরিমাণে এলএনজি কিনে রাখা। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ মজুদ ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে তেলের মজুদ ক্ষমতা ৪৫-৫০ দিনের। এটিকে অন্তত ১৮০ দিনে উন্নীত করার জন্য বৃহৎ আকারের স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করতে হবে। সিস্টেম লস কমাতে হবে। গ্যাস ও তেলের বিতরণ ব্যবস্থায় অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমন্বয় করে আমদানির পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। ভারত থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির পরিমাণ বাড়ানো এবং পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ভারত যেসব উৎস দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করে, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে।

মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারের বিশাল গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস আমদানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে স্থগিত হয়ে থাকা পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। এ ছাড়া আঞ্চলিক জ্বালানি বাজার উন্নয়নে নজর দেওয়া যেতে পারে। যেমন দক্ষিণ এশীয় গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি বিনিময়ের স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা। তবে সবচেয়ে উত্তম কৌশল হলো, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে দেশীয় বিকল্প জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আসলে দেশীয় উৎসের উন্নয়নই সবচেয়ে টেকসই সমাধান। এক্ষেত্রে রিনিউয়েবল এনার্জি বা সোলার এনার্জির উন্নয়ন ও ব্যবহারের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন শিল্পকারখানা ও বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করা। চরাঞ্চলগুলোতে বড় আকারের সোলার পার্ক নির্মাণ। উইন্ডমিল বা বায়ুশক্তির ব্যবহারও এক উত্তম বিকল্প। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে যেমন : কক্সবাজার, মোংলা বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপক সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। রান্নার কাজে বায়োগ্যাস ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। হাইড্রো-ইলেকট্রিসিটি বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে নতুনভাবে নজর দিতে হবে। হাইড্রো পাওয়ারের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক কম। এ জন্য বিদ্যমান কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপ্রকল্প এবং গঙ্গা ব্যারেজে হাইড্রো-ইলেকট্রিসিটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা একটি উত্তম সমাধান। এর পাশাপাশি নেপাল বা ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। পরিবহন খাতেও সংস্কার জরুরি। যানবাহনে সিএনজি ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের বদলে স্থানীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে গণপরিবহন চালানো নিশ্চিত করা যেতে পারে। আধুনিক যুগের ইলেকট্রিক যানের প্রসারণ প্রয়োজন। দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং ইভি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়ে জনগণকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এটি তেলের ওপর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে। তেলের ওপর চাপ কমাতে যানবাহনে সিএনজি রূপান্তর ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। ইতিমধ্যেই ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ৩০% যানবাহন ইলেকট্রিক করার লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা করা হয়েছে। তাই ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড়, রেজিস্ট্রেশন ফিতে ৫০% ছাড় এবং ব্যাংকিং ঋণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে, আরেকটি উত্তম বিকল্প হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। বিশ্বে এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ফ্রান্স। এ কারণে ইরান যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট চলমান সংকটে ফ্রান্স সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রায় শেষের পথে। নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি বাংলাদেশে পরমাণু শক্তির পরিধি আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশ সরকার পারমাণবিক বিদ্যুৎকে ‘বেস লোড’ হিসেবে গণ্য করছে। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল সমাধান। পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৬ সালের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এটি চালু হলে, দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানিকৃত গ্যাস বা কয়লা ছাড়াই মেটানো সম্ভব হবে। এরপর দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। রূপপুরের সফলতার পর সরকার দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দ্বিতীয় একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে পটুয়াখালীর পায়রা, বরগুনার তালতলী অথবা ভোলা জেলাকে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে পানির পর্যাপ্ততা থাকায় পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমের জন্য সুবিধাজনক। এই দ্বিতীয় প্রকল্পের জন্য রাশিয়া ছাড়াও চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর উন্নত ও নিরাপদ প্রযুক্তির কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকট নিরসনের আরেকটি উপায় হলো, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ছোট আকারের মডুলার রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একবার চালু হলে, তা অন্তত ৬০-৮০ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারে। তাই ইরান যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে যখন তেলের জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তখন পারমাণবিক শক্তি দেশের শিল্পকারখানা ও জাতীয় গ্রিডকে সচল রাখতে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। বস্তুত ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেললেও এটি আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে টেকসই বিকল্প জ্বালানির দিকে যাওয়ার বড় সুযোগ। দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি আমাদের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল চাবিকাঠি। তবে এই সংকট নিরসনে আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লিটারপ্রতি অকটেনের পূর্ববর্তী মূল্য ১২০ টাকা বৃদ্ধি করে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের পূর্ববর্তী মূল্য ১১৬ টাকা বৃদ্ধি করে ১৩৫ টাকা, ডিজেলের পূর্ববর্তী মূল্য ১০০ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা এবং কেরোসিনের পূর্ববর্তী মূল্য ১১২ টাকা বৃদ্ধি করে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়া এবং বীমা খরচ বেড়ে যাওয়াকেও সরকার দায়ী করেছে। সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মূল্য সমন্বয় অপরিহার্য ছিল। তবে জ্বালানির এমন দাম বৃদ্ধির প্রভাব আমাদের দেশের অর্থনীতির ওপরে পড়বে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে দেশের সরকার ও মানুষকে এই মূল্য বৃদ্ধি মেনে নিতে হচ্ছে। বস্তুত এ ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিকল্প পন্থা। মূলত এর মাধ্যমেই জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত