যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুমাস হতে চললেও, দুপক্ষের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগামী ও বন্দর ত্যাগকারী জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত তারা নতুন করে আলোচনায় বসবে না। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি এবং স্থবির হয়ে পড়া কূটনীতি, এই দুইয়ের বৈপরীত্য বর্তমান পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকেই সামনে আনছে। পাশাপাশি ইরানি জাহাজ জব্দের ঘটনা আগুন আরও উসকে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে; বিশ্ব বাজারে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও, তা এখনো সংলাপের গতি তৈরি করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে ইরানের নেতারা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে ‘পিছু হটেছেন’ ট্রাম্প। ইরানের নেতৃত্বের চোখে যুদ্ধের ধকল সহ্য করার ক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে তাদেরই বেশি। চলমান যুদ্ধবিরতির ফলে তাদের সেই বিশ্বাস আরও জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারপরও ইরানের নেতারা মনে করছেন, তারা দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধের চাপ সইতে সক্ষম। তবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাটা ট্রাম্প বেশি দিন সহ্য করতে পারবেন না। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, ইরানিরা মাস ধরে নিজেদের সময় হিসাব করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও বিশ্ব অর্থনীতির সময়কে দেখে সাপ্তাহিক হিসেবে। এই বিশ্লেষক আরও বলেন ট্রাম্প আরও তিন সপ্তাহও এই প্রণালির বন্ধ থাকা সহ্য করতে পারবেন না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ নৌ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়েছে। শুধু তেলের দাম বেড়েছে, তা নয়। সার ও গ্যাসেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
এদিকে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ পারস্য উপসাগরের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল ও ক্লাউড অবকাঠামোর একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এটিকে অঞ্চলটির ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার ওপর একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বুধবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তাসনিম হরমুজ প্রণালিকে শুধু জ্বালানি সরবরাহের পথ হিসেবেই নয়, বরং সাবমেরিন কেবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবেও উল্লেখ করেছে। সম্প্রতি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে ‘নতুন তুরুপের তাস’ খেলবে তেহরান। এ পথ দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগের মূল কেবলগুলো গেছে।
প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের দেশগুলো ইন্টারনেটের জন্য ইরানের তুলনায় অনেক বেশি সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকরা বলছেন, তাসনিমের প্রতিবেদনটি সাধারণ কোনো কারিগরি তথ্য নয়; বরং এটি ওই অঞ্চলের কেবল, ল্যান্ডিং স্টেশন এবং ডেটা সেন্টারগুলোকে চলমান সংঘাতের কৌশলগত চাপের উৎস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষ করে আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে অবস্থিত ক্লাউড ও ডেটা সেন্টার অবকাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে এসব স্থাপনায় বিপর্যয় ঘটলে তার অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত প্রভাব হবে ভয়াবহ। সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আরব আমিরাত ও বাহরাইনে আমাজন ওয়েব সার্ভিসের স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ক্লাউড অবকাঠামোর নিরাপত্তা ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাসনিমের প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এখন সাবমেরিন কেবল ও আঞ্চলিক ডেটা সেন্টারগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় যুক্ত হয়েছে।