আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের আকাশে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে: বর্তমানে ইরান আসলে কে চালাচ্ছেন?
আনুষ্ঠানিকভাবে এর উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুত্র মোজতবা খামেনেই। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থায় এই পদটিই সর্বেসর্বা। যুদ্ধ, শান্তি কিংবা রাষ্ট্রের কৌশলগত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
তবে বাস্তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ধোঁয়াশাপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে 'ছিন্নভিন্ন' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো 'একীভূত প্রস্তাব' আসার অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন।
নেতৃত্বের এই অনৈক্যের বিষয়টি সম্ভবত ইরানি নেতাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দেশটির নাগরিকদের মোবাইলে পাঠানো এক সরকারি বার্তায় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ইরানে কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী বলে কিছু নেই পুরো জাতি এক এবং সবার পথও এক।
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মোজতবা খামেনেইকে একবারও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার নির্দেশনাসহ গুটিকতক লিখিত বিবৃতি ছাড়া তার প্রাত্যহিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই।
ইরানি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধের শুরুর দিকের হামলায় মোজতবা আহত হয়েছেন। তবে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমস ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মোজতবার মুখে মারাত্মক আঘাত লেগেছে, যার ফলে তার কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে।
ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এই অনুপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ক্ষমতা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং প্রদর্শনমূলকও বটে। প্রয়াত আলী খামেনেই বিভিন্ন ভাষণ, সুপরিকল্পিত উপস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতেন। বর্তমান ব্যবস্থায় সেই সংকেত বা দিকনির্দেশনার অভাব প্রকট। এর ফলে দেশটিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যুদ্ধের কারণে মোজতবা নিজের কর্তৃত্ব স্থাপনের সময় পাননি; আবার কেউ কেউ তার শারীরিক সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন।
কাগজে-কলমে কূটনৈতিক কার্যক্রম সরকারের হাতে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অধীনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা কেউই রণকৌশল নির্ধারণ করছেন বলে মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ থাকায় তাদের কর্তৃত্ব আরও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
আরাগচির ভূমিকা এখন কেবল নির্দেশ পালনকারীর মতো। হরমুজ প্রণালী খোলা বা বন্ধ রাখা নিয়ে তার বক্তব্যে যে দ্বিধা দেখা গেছে প্রথমে খুলে দেওয়ার কথা বলে পরে দ্রুত তা প্রত্যাহার—তা থেকে স্পষ্ট যে সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর কূটনীতিবিদদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলেও স্বাধীন কোনো অবস্থান নিতে পারেননি। ইসলামাবাদে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনা থমকে যাওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, কূটনৈতিক পথ খোলা থাকলেও ইরান কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দিতে এখনো অক্ষম।
বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হলো হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক দলের হাতে নয়, বরং আহমদ ওয়াহিদির নেতৃত্বাধীন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর হাতে।
এর ফলে প্রকৃত ক্ষমতা চলে গেছে পর্দার আড়ালে থাকা ব্যক্তিদের হাতে। আগের সংকটগুলোর মতো এবার কোনো একক শক্তিশালী নেতার দেখা মিলছে না। বরং দেখা যাচ্ছে, আগে হামলা চালানো হচ্ছে এবং পরে তার সাফাই গেয়ে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, যা সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইআরজিসি-র এই স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধির ফলে বোঝা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে সামরিক বাহিনীই এখন সংকটের গতিপথ নির্ধারণ করছে।
নেতৃত্বের এই অস্পষ্টতার সুযোগে সামনে এসেছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ। সাবেক এই বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। তিনি আলোচনার টেবিলে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করছেন এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরছেন।
তবে কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকে আলোচনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আলোচনাকে শত্রুর সামনে দুর্বলতা হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। এই অবস্থায় কলিবাফের অবস্থানও নড়বড়ে। তিনি দাবি করছেন যে, তিনি মোজতবা খামেনেইর নির্দেশেই কাজ করছেন, তবে এর পক্ষে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ নেই।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা সচল থাকলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্ব কাগজে আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব নেই, কূটনীতি আছে কিন্তু তা সিদ্ধান্তমূলক নয়। সামরিক বাহিনী ক্ষমতার কলকাঠি নাড়লেও তাদের কোনো প্রকাশ্য স্থপতি নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যবস্থার পতন ঘটেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো টিকে আছে। কিন্তু প্রবল চাপের মুখে ইরান তার শক্তিকে (যেমন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ক্ষমতা) একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে রূপান্তর করতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থাটি কোনোমতে টিকে থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়—নেতৃত্বের এই ঐক্য কি আসলে কার্যকর, নাকি এটি কেবলই দাবি করা হচ্ছে?
সূত্র; বিবিসি