রোহিঙ্গাদের ‘রাখাইনের বাঙালি’ দাবি করল মায়ানমার

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

মায়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে দাবি করেছে মায়ানমার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় যাচাইয়ে প্রমাণিত ব্যক্তিদেরই বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খবর বিবিসি বাংলার। 

শনিবার (১৫ আগস্ট) প্রকাশিত বিবৃতিতে মায়ানমার জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যাচাই করা বাস্তুচ্যুতদের ফেরত নিতে তারা প্রস্তুত। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া তালিকায় থাকা মানুষের সংখ্যা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দেশটি।

মায়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুতদের বিষয়ে ‘একপেশে, ভুল তথ্য ও অপতথ্য’ প্রচার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের জাতিগত পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে দেশটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে থাকা সবাইকে মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দেশে যাওয়া ব্যক্তিদের এমন একটি জাতিগত পরিচয়ে পরিচিত করা হচ্ছে, যা মায়ানমারে কখনো ছিল না। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গ টেনে দেশটি দাবি করেছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে মায়ানমারে কোনো জাতিগত গোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই।

মায়ানমার আরও দাবি করেছে, বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে সমাধানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে আরসা ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে পুলিশ ফাঁড়ি ও ব্যাটালিয়নে সমন্বিত হামলা চালায়। এর জবাবে মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী ‘প্রতিরক্ষামূলক’ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায় বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।

মায়ানমারের দাবি, আরসার হামলার পর স্থানীয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ অন্য শহর ও গ্রামে চলে যায় এবং ‘বিপুলসংখ্যক বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। দেশটির হিসাব অনুযায়ী, আরসার হামলার আগে বুথিদং, মংডু ও রাথিডং টাউনশিপে সাত লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। এর মধ্যে ঘটনার পর দুই লাখের বেশি মানুষ সেখানে থেকে যায় এবং পাঁচ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায় বলে দাবি করেছে মায়ানমার।

এই হিসাবের ভিত্তিতে দেশটি বলছে, ‘রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে’—এমন তথ্য সঠিক নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুতদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তিন দফায় প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ‘একজনও’ বাংলাদেশ থেকে মায়ানমারে ফেরত যায়নি বলে দাবি করেছে নেপিদো।

বাংলাদেশের দেওয়া আট লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত চার লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। মায়ানমারের দাবি, যাচাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। চার হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এক লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মায়ানমার জানিয়েছে, যাচাইয়ে উত্তীর্ণ বাস্তুচ্যুতদের দ্রুত ফেরত নেওয়ার বিষয়ে তারা ‘আন্তরিক সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ করছে। তবে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হওয়ার পর যাচাই হওয়া সাবেক বাসিন্দাদের গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে দেশটি।

মায়ানমারের এই বিবৃতি নিয়ে শনিবার রাত পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা এবং তাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করা মায়ানমারের পুরোনো অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। তাদের ভাষ্য, বিবৃতির মাধ্যমে মায়ানমার মূলত নিজেদের বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘদিন পর প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নতুন করে আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও দেখছেন কেউ কেউ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত