সীমান্তে ড্রোন, এন্টিড্রোন ও মাইন ডিটেক্টর ব্যবহার হবে

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

সীমান্তরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ড্রোন, এন্টিড্রোন, মাইন ডিটেক্টর ও বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের কথা বলেছে সরকার। দেশের ভেতরে ও সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশকে কঠোর হতে বলা হয়েছে। অত্যুৎসাহী হয়ে কোনো কাজে সম্পৃক্ত না হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সরকার মোট ২০ বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ৯টি পুলিশের বিষয়ে, বাকি ১১টি অন্যান্য বাহিনী ও অধিদপ্তরের বিষয়ে।

উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তে অবৈধ চোরাচালান ও অবৈধ পারাপার ঠেকাতে নতুন এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রসহ সন্ত্রাসীদের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করারও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারেক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার পর সন্ত্রাসীরা ভারতে পালানোর সময় গ্রেপ্তার হয়। এরপর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার পর সন্ত্রাসীরা ভারতে চলে যায়। এসব বিবেচনা করে বিএনপি সরকার গঠনের পরেই সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয়।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকের সভাপতি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সম্প্রতি সেই বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের একটি বিবরণী এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অধিদপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের নিয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে পুলিশের ‘চেইন অব কমান্ড’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক অধিদপ্তর ও সংস্থাকে তাদের সমস্যা ও সমস্যা সমাধানের কৌশল জানাতে বলা হয়েছে এবং স্বল্পমেয়াদি (৩-৬ মাসে বাস্তবায়নযোগ্য), মধ্যমেয়াদি (১-২ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য) ও দীর্ঘমেয়াদি (৩-৫ বছরে বাস্তবায়নযোগ্য) এই তিন ধাপে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জনে পুলিশকে পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। বিগত সময়ে যেসব পুলিশ সদস্য জনগণের ওপর অন্যায়-অবিচার করেছে তাদের মোটিভেশন, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোরভাবে পুলিশের কাজে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা যাতে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য নিয়মিত মনিটরিং করার কথা বলেছেন।

সংস্থাপ্রধানদের সঙ্গে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, মামলায় নির্বিচারে আসামি করার প্রবণতা থেকে পুলিশকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রকৃত আসামিকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিক তদন্তের পর এফআইআর গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। মামলা দ্রুত ও যথাযথভাবে নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কার্যকরী যোগাযোগ রাখতে হবে। 

বৈঠকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনবল সমস্যার সমাধান এবং গাড়ি কেনার বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্তও হয়েছে। র‌্যাবের জন্য যুগোপযোগী আইন প্রণয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনালের জন্য পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) ৯০০ জনবল জোগানের কার্যক্রম স্বল্প সময়ে শেষ করতে বলা হয়েছে। সব বিভাগীয় শহরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের সিদ্ধান্তও হয়েছে।

বৈঠকে বিজিবিকে সীমান্তরক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এ সম্পর্কিত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ড্রোন, এন্টিড্রোন, মাইন ডিটেক্টর, বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, জনগণের ভোগান্তি লাঘবে পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণের জন্য অনলাইনে আবেদন অনুমোদিত ভেন্ডারের মাধ্যমে সম্পাদন করা যায় কি না সে বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করার দায়িত্ব বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অতি পুরনো প্যাট্রোল বোটগুলো ক্রমান্বয়ে প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সঙ্গে টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ ২০২৬-এর যে বিষয়গুলো সাংঘর্ষিক সেসব বিষয়ে প্রস্তাব দাখিল করার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব জনবলের প্রস্তাব এবং সংস্থার ধানমন্ডির অফিস সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের পর একটি চিঠিতে সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কারাবন্দি থাকায় ছোট অপরাধে দ-িতদের মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা  হয়েছে। কারাবন্দিদের চিকিৎসাসেবার জন্য ডাক্তারের পদায়ন এবং অ্যাম্বুলেন্স কেনার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এ পর্যন্ত কতগুলো অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে, কতজন অস্ত্র কিনেছে, বর্তমানে কতটি বৈধ লাইসেন্স রয়েছে তার একটি তালিকা চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

যেসব অধিদপ্তর/সংস্থার পদ সৃজনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগে ঝুলে আছে সেসবের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। শূন্য পদে নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করার পাশাপাশি চলমান নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন) আহমেদুল কবীরের ২০ এপ্রিল সই করা চিঠিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অধিদপ্তর ও বাহিনীপ্রধানদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পুলিশের সব ইউনিটকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমান্তে ড্রোন ও মাইন ডিটেক্টর বসানোর সিদ্ধান্ত ভালো একটি দিক। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে মাইন বসিয়েছে, বিজিবিরও মাইন ডিটেক্টর দরকার। সরকার এ বিষয়ে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাজ হলো, এটাকে কার্যকরী করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। আরাকান আর্মি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে মাইন বসিয়েছে, এতে নিরীহ মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এসব প্রাণঘাতী অস্ত্র শনাক্ত করাও জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ ও র‌্যাবের সংস্কার দরকার, এর জন্য কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এসব বাহিনীর হাত ধরে আগে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা যেন ভবিষ্যতে না ঘটে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত