আলোচনায় অগ্রগতির সম্ভাবনা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও পাল্টা হুমকির মধ্যেও যুদ্ধ বন্ধের জন্য দেশ দুটিকে আবার আলোচনায় ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক গতকাল শুক্রবার এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার সুযোগ খতিয়ে দেখতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গতরাতেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এ কারণে তেহরান ও ইসলামাবাদের সরকারি সূত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে কথা হয়েছে। ইসহাক দার নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে ইরানের মন্ত্রী পাকিস্তানের ‘ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার’ প্রশংসা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে পাঠানো দেশটির নিরাপত্তা ও লজিস্টিক দল আগে থেকেই ইসলামাবাদে রয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবারকার ইসলামাবাদ সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কেউ সেখানে থাকবেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাকিস্তান ছাড়াও রাশিয়া ও ওমান সফরের সম্ভাবনা আছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও আশপাশে ইরানের সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও আরব সাগর অঞ্চলে ইরানের মাইন পাতার জাহাজ, ছোট দ্রুতগামী নৌযান ও কিছু স্থায়ী সামরিক স্থাপনায় এ হামলা চালানো হতে পারে।

এএফপি, আল জাজিরা ও মিডল ইস্ট মনিটরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গতকাল শুক্রবার এমন হামলার পরিকল্পনার কথা জানায়। হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আমেরিকা আরব সাগরে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আনছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) রণতরীটির তথ্য দিলেও তা মধ্যপ্রাচ্যে আগে থেকে অবস্থান করা জাহাজগুলোর সঙ্গে যোগ দেবে, নাকি কোনো একটি রণতরীর পরিবর্তে আসছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশে^র বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বর্তমানে লোহিত সাগরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নতুন করে হামলার পরিকল্পনা চলতে থাকলেও ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে তিনি পারস্য সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার ভয়ানক হামলার হুমকি দিলেও দৃশ্যত এখন তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।

হোয়াইট হাউজে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, কোনো অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘পরমাণু অস্ত্র যাতে কেউ কোনোভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

অন্যদিকে, ইরান বলেছে, দেশটির তেলক্ষেত্রে কোনো ধরনের হামলা হলে সমপরিমাণ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাকাব এসফাহানি এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমাদের কৌশল হবে ‘চোখের বদলে চোখ’। আমাদের কোনো তেলকূপে আঘাত করা হলে, যে দেশের মাটি ব্যবহার করে আমাদের ওপর আক্রমণ চালানো হবে, সেই দেশের তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হবে।”

ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের তেলক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সুপেয় পানির প্ল্যান্টগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে এ যুদ্ধের সূচনা করে। গতকাল ছিল যুদ্ধের ৫৬তম দিন। এর মধ্যে গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ১১ ও ১২ এপ্রিল প্রথম দফায় প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় গত সপ্তাহে আবার বসার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ শুরু করায় ইরান আলোচনা বয়কট করে।

যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা ও আকাক্সক্ষা বিসর্জন দিক। ইরান এতে নারাজ।

মস্কোয় ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো আলোচনা অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে এই আলোচনায় ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং পুনরায় হামলা না করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

ট্রাম্প অবশ্য ইরানের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে গতকাল পর্যন্ত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘উপযুক্ত ও লাভজনক’ না হওয়া পর্যন্ত তার দেশ ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাবে না।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রচার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেকে ধারণা করছেন তিনি যুদ্ধ শেষ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এ ধারণা উড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার হাতে অফুরন্ত সময় আছে। কিন্তু ইরানের নেতাদের সময় ফুরিয়ে আসছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশ দুটি ইরানের বর্তমান নেতাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট হামলার পরিকল্পনা করছে।

এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন হামলায় অন্য সামরিক ও বেসামরিক নেতারা নিহত হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত